একুশে পদকজয়ী নারী ফুটবলারদের সঙ্গে কোচের দ্বন্দ্ব কেন

বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে একুশে পদক তুলে দেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। পরে তাঁদের সঙ্গে ছবি তোলেন। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনেছবি: পিআইডি

টানা দুইবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়--বাংলাদেশের খেলাধুলায় এমন কিছুর দেখা খুব একটা মেলেনি আগে। সে কারণেই আনন্দের মাত্রাটাও ছিল বেশি। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সরকার যে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে এতটা সম্মানে সম্মানিত করবেন, সেটি আগে বোঝা যায়নি। যে একুশে পদক দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা, যে সম্মাননা আগে কখনোই বাংলাদেশের কোনো ক্রীড়াদলকে দেওয়া হয়নি, ড. ইউনুসের সরকার সাফজয়ী সাবিনা খাতুন, সানজিদা আক্তার, মাসুরা পারভীন ঋতুদের সেই সম্মানেই সম্মানিত করলেন।

তবে বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা এই সম্মান এমন একটা সময় পেলেন, যখন, মেয়েদের ফুটবল নিয়ে এক ধরনের অচলাবস্থা চলছে। জাতীয় দলের ১৮ নারী ফুটবলার ইংলিশ কোচ জেমস পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিদ্রোহই করে বসেছেন। মেয়েদের ফুটবল দলকে একুশে পদকের মতো সম্মাননা দেওয়া যেমন বিরল ঘটনা, ঠিক তেমনি, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো ‘বিদ্রোহী’দের রাষ্ট্রীয় সম্মানে সম্মানিত করাও বোধহয় অনন্য, অবিশ্বাস্য এক ঘটনাই।

এই অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষীই এখন দেশের ক্রীড়াঙ্গন। শুধু ক্রীড়াঙ্গন কেন, এই ঘটনা এখন ক্রীড়াঙ্গনকেও ছাপিয়ে গেছে।

ইংলিশ কোচের সঙ্গে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের দ্বন্দ্বের কথাটা প্রকাশ্যে এসেছিল গত অক্টোবরে, নেপালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ চলার সময়ই। বাটলার দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের খুব একটা পছন্দ করেন না---এই তথ্যটি অনেকটাই ‘হাঁটে হাড়ি ভাঙা’র মতো করে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন দলের অন্যতম সেরা ফুটবলার মনিকা চাকমা। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে নিজেদের প্রথম ম্যাচটা বাংলাদেশের জন্য খুব একটা ভালো হয়নি। যে দলটির বিপক্ষে হার মেয়েরা কল্পনাও করতে পারে না, সেই পাকিস্তানের বিপক্ষেই বাংলাদেশ হারতে হারতে কোনোমতে ড্র করল, তাও খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে শামসুন্নাহার জুনিয়রের গোলে। ম্যাচটায় কোচ বাটলার মাসুরা, সানজিদাদের মতো বেশ কয়েকজন পরীক্ষিত ফুটবলারকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছিলেন। মনিকা ম্যাচের পরদিন নেপালে সাফ কাভার করতে যাওয়া সাংবাদিকদের কোচের সঙ্গে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের ব্যাপারটি প্রকাশ্যে আনেন। দেশের নারী ফুটবলারদের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার শুরুটা সেদিন থেকেই। সব আলোচনা-সমালোচনা, সব বিতর্কের শুরুটাও সেদিন থেকেই। কিন্তু কোচের সঙ্গে এই দ্বন্দ্ব নিয়েই মেয়েরা সাফ জিতেছিল শেষ পর্ন্ত। ভারতকে পরের ম্যাচে রীতিমতো উড়িয়েছিল তারা। সেমিত ভুটানও পাত্তা পায়নি। আর ফাইনালে কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে নেপালের বিপক্ষে ফাইনাল তো ইতিহাসের পাতাতেই স্থান করে নিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, দলের কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানোর পরও বাংলাদেশের মেয়েরা দেশকে এত বড় আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছেন।

কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্বের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল মেয়েদের?

বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের প্রধান কোচ পিটার বাটলার
ছবি: বাফুফে

এই পিটার বাটলার বাংলাদেশে এসেছিলেন বাফুফের এলিট ফুটবল একাডেমির হেড কোচ হয়ে। তাঁর প্রোফাইল যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তিনি খেলোয়াড় হিসেবে ছিলেন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে উঁচু পর্যায়ে। খেলেছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে। কোচ হিসেবেও তিনি হাই প্রোফাইলেরই। আফ্রিকার একাধিক দেশে কাজ করেছেন। লাইবেরিয়া আর বতসোয়ানা জাতীয় ফুটবল দলের কোচ ছিলেন। এই বাটলারকে বাংলাদেশের মেয়েদের জাতীয় দলের কোচ বানিয়েছিলেন বাফুফের সাবেক সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন। সামনেই ছিল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো সাফ জেতার পর সাবিনাদের সামনে ছিল সেই সাফ শিরোপা ধরে রাখার কঠিন মিশন।

বাটলার আপাদমস্তক পেশাদার কোচ। শৃঙ্খলা যাঁর কাছ সবচেয়ে বড় বিষয়। দল গঠনে পারফরম্যান্সই মূখ্য। কোচের দায়িত্ব পেয়ে তিনি বাংলাদেশ নারী দলে একই উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়েই সমস্যাটা টের পান। দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স কাঙ্খিতমানের নিচে, নারী দলের অনেকেরই শৃঙ্খলার বিষয়ে ধারণা কম। গত মে-জুনে চীনা তাইপের বিপক্ষে মেয়েরা দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল ঢাকাতেই। কিন্তু সে দুটি ম্যাচে দলের পারফরম্যান্স মোটেও সন্তোষজনক ছিল না। প্রথম ম্যাচে ৪-০ আর দ্বিতীয় ম্যাচে ১-০ গোলে হেরে যায় দল। তবে সে দুটি ম্যাচে বাটলার পরীক্ষা চালান। বোঝাই যাচ্ছিল দলটাকে নিজের মতো করেই চালাতে চান এই ইংলিশ কোচ। তাঁর চোখ ছিল উঠতি কয়েকজন খেলোয়াড়ের ওপর। অনূর্ধ্ব-১৯ দলটা গত বছরই ঢাকায় ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে সাফের শিরোপা জিতেছিল। সে দলের উঠতি প্রতিভাদের ঘষে মেজে জাতীয় দলের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহটাই পছন্দ হয়নি বাফুফের ক্যাম্পে থাকা সিনিয়র খেলোয়াড়দের।

সাফ জিতে আসার পর মনে হয়েছিল দ্বন্দ্বটা বুঝি চাপা পড়ে গেছে। অক্টোবরে সাফ জয়ের পর কোচ বাটলারও নিজের ক্ষোভ ঝেড়েছিলেন দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের ব্যাপারে। তিনি যে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে যথেষ্ট ‘সম্মান’ পাননি, সেটি ইঙ্গিতে গণমাধ্যমের সামনে বলেছিলেনও। ডিসেম্বর মাসের ৩১ তারিখ বাটলারের প্রথম চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। জানুয়ারিতে নতুন চুক্তি নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে ফেরেন তিনি। নাটকের পরের পর্বগুলো মঞ্চায়িত হয় এর পরপরই।

জানুয়ারি মাসে বাটলার বাংলাদেশে ফেরার পরদিনই বাফুফে ভবনে সাংবাদিকদের ডেকে বিদ্রোহটা করেই বসেন সাবিনাকে নেতা মানা ১৮ নারী ফুটবলার। বাটলারের বিরুদ্ধে তাঁদের অনেক অভিযোগ। তবে সেই অভিযোগগুলো কতটা যুক্তিযুক্ত, প্রশ্ন উঠেছে সেটি নিয়েও। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের ১৮ বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে উল্টো অভিযোগ ওঠে শৃঙ্খলাভঙ্গের। একে তো সাংবাদিকদের সামনে বিদ্রোহ করা, অন্যদিকে তাঁদের বিরুদ্ধে কোচের কথা না শোনার গুরুতর অভিযোগ---এই ঘটনায় মেয়েরা যে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের খুব সহানুভূতি পাচ্ছেন, ব্যাপারটি এমন নয়। নারী ফুটবলারদের বিরুদ্ধে বাটলারের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অহেতুক সময় কাটান তাঁরা। সেই অভিযোগের সত্যতা বলুন কিংবা প্রমাণ বলুন, সবই একেবারে প্রকাশ্য। ফেসবুক, ইনস্টাতে ভাইরাল নারী ফুটবলাদের রিল। মেয়েদের বিদ্রোহের ব্যাপারে বাফুফে যে ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি বানিয়েছিল, সেই তদন্ত কমিটির তদন্তেও এসব উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন

মেয়েরা যখন একুশে পদক গ্রহণ করেছেন, তার কয়েকদিন আগে বাফুফের নারী ফুটবল উইংয়ের মাধ্যমে বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে সংকট এখনো কাটেনি। বাটলার ১৮ বিদ্রোহী ফুটবলারের মধ্যে ৮ জনের ব্যাপারে তাঁর চূড়ান্ত আপত্তি জানিয়ে রেখেছেন। মানে সাবিনা, সানজিদা, মাসুরা, নিলুফা, মাতসুশিমা সুমাইয়া, শামসুন্নাহার সিনিয়র আর মারিয়া মান্দা অনুশীলনে এলে তিনি নাকি অনুশীলনই করাবেন না। অন্যদিকে নারী ফুটবল উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরনের আরও একটি কথায় নতুন করে সমস্যার উদ্ভব হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। তিনি বলেছেন নারী উইং নাকি এই বাটলারের সঙ্গে নতুন চুক্তি না করারই যুক্তি দিয়েছিল, কিন্তু বাফুফের কোচ বিষয়ক কমিটি সেটি মানেনি। তাঁর কথায় স্পষ্ট কোচের সঙ্গে খেলোয়াড়দের দ্বন্দ্বের সমাপ্তি টানার জন্য বাফুফের নারী উইংয়ের ভূমিকা এখানে সামান্যই। সামনে এ নিয়ে আরও অশান্তি, আর জলঘোলা হওয়ার শঙ্কাটা থেকেই যাচ্ছে।

আপাতত, সাফজয়ী মেয়েদের একুশে পদক প্রাপ্তি আমাদের উদ্যাপন করাই উচিত সবকিছু ভুলে। বিদ্রোহ, কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্ব এসব ছাপিয়েও নারী ফুটবল দল এমন একটা সময় একুশে পদক পেলেন, যখন এটি হয়ে থাকছে দেশের নারী ফুটবলের প্রতি রাষ্ট্রের এক ধরনের শক্ত সমর্থন। নারী ফুটবলারদের একুশে পদক প্রাপ্তি এ দেশের মেয়েদের ফুটবলকে আরও বড় লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির শুরুও। তবে একুশে পদক, এই সম্মাননা নারী ফুটবলের যাবতীয় অচলাবস্থার সমাপ্তির ক্ষেত্র শক্ত করে তৈরি করুক, চাওয়া সেটিই।

আরও পড়ুন