৭০ বছরের অপেক্ষা শেষে ‘চ্যাম্পিয়ন’ নিউক্যাসল
রেফারি জন ব্রুকস শেষ বাঁশি বাজাতেই অদ্ভুত এক শূন্যতা ভর করল ওয়েম্বলিজুড়ে। এই বুঝি শেষ! প্রাপ্তির সুখ এমন? সত্তর বছরের প্রতীক্ষা, বারবার শিরোপা হারিয়ে, মালিকানা পাল্টে, রেলিগেশনের লড়াই শেষে শিরোপার স্বাদ এমনই হয়! ওয়েম্বলির এক প্রান্তজুড়ে আঁটি গেড়ে থাকা সমর্থকেরা তখনো ধাতস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। ওয়েম্বলির শেষ বাঁশি যে তাদের নতুন সূচনার চাবিকাঠি। নিউক্যাসল বস এডি হাউই গিয়ে হাত মেলালেন লিভারপুল কোচ আর্নে স্লটের সঙ্গে। পেছনে ফিরতেই চোখে পড়ল, সাদা-কালো এক আনন্দের জোয়ার ভেসে আসছে তাঁর দিকে। হাউইও গা ভাসিয়ে দিলেন সে জোয়ারে।
গত সাত দশকে একপ্রকার আঁস্তাকুড়ে নিমজ্জিত হয়েছিল নিউক্যাসল। প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমন, টুর্নামেন্টগুলোতে বাজে পারফরম্যান্স; সব মিলিয়ে ইংলিশ ফুটবলে নিউক্যাসলকে খুঁজে পাওয়াই ছিল কঠিন। প্রিমিয়ার লিগের সূচনালগ্নে নিউক্যাসল যাত্রা শুরু করেছিল হেভিওয়েট হিসেবে। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই একই খাঁচায় আটকে পড়েছিল ম্যাগপাইরা। শিরোপার সঙ্গে সম্পর্কটা বরাবরই অম্লমধুর। গত ৭০ বছরে ফাইনাল খেলার সৌভাগ্য হয়েছে বহুবার। বিশাল স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিয়েছে ওয়েম্বলিতে, কিন্তু প্রতিবারই ফিরেছে ব্যর্থ মনোরথে। ইংল্যান্ডের জাতীয় মাঠটাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের জন্য। শেষ ৯ ম্যাচের ৯টিতেই হার তাদের, ৭০ বছরের অপেক্ষা শেষে দশম ম্যাচে জয়টা এনে দিলেন ইংলিশ কোচ এডি হাউই।
শেষ যেবার ইংল্যান্ডে কোনো শিরোপা জিতেছিল নিউক্যাসল, তখন বাংলাদেশ নামের কোনো দেশের অস্তিত্ব ছিল না। চালু হয়নি চ্যাম্পিয়নস লিগও। ১৯৫৫ সালের এফএ কাপ ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটিকে হারিয়ে শেষবারের মতো শিরোপার দেখা পেয়েছিল নিউক্যাসল।
কারাবাও কাপের ফাইনালে ফেবারিট হিসেবে শুরু করেছিল লিভারপুল। প্রতিপক্ষ নিউক্যাসল বলে নিয়মিত গোলরক্ষককে ছাড়াই শুরু করেছিলেন আর্নে স্লট। কিন্তু কে জানত, এই একটি ভুল সিদ্ধান্তের মাসুল দিতে হবে তাঁকে? এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই শিরোপা থেকে বিদায় নেবে, এমনটা খোদ লিভারপুল হেটারও হয়তো ভাবেননি। প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে প্রথম গোল হজম করে লিভারপুল। নিউক্যাসলকে এগিয়ে নেন ইংল্যান্ড দলে ডাক পাওয়া ডিফেন্ডার ড্যান বার্ন। তখনো চিন্তায় পড়েনি লিভারপুল। সালাহ আছেন, আছেন জোতা, দিয়াজও। আর্নে স্লটের চিন্তা কি?
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে হানা দিলেন নিউক্যাসলের আলেকজান্দার ইসাক। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সুইডিশ তারকা দ্বিগুণ করলেন ব্যবধান। দুই গোলের চাপ আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি সালাহ-জোতারা। নিউক্যাসলের দেয়ালের সামনে কোনো কাজেই আসেনি তাদের মুহুর্মুহু আক্রমণ। শেষ মিনিটে দেওয়া ফেদেরিকো কিয়েসার গোল ব্যবধান কমিয়েছে শুধু। আটকাতে পারেনি নিউক্যাসলকে। বরং ৭০ বছর পর শিরোপার ঘ্রাণ প্রবেশ করেছে নিউক্যাসলের দুয়ারে।
নিউক্যাসলের রেকর্ডের রাত নিজের করে নিয়েছিলেন ব্রিটিশ কোচ এডি হাউই। বয়স মাত্র ৪৭, এর মাঝেই ইংল্যান্ডের সেরা কোচদের একজন হয়ে উঠেছেন তিনি। অল্প বয়সে কোচিং শুরু করেছেন, ছোট দল নিয়ে চমকও দেখিয়েছেন; আধুনিক ফুটবলে এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়। ২০০৮ সালে কোচিং শুরু করেন এডি। হাঁটুর চোটের কারণে মাত্র ২৯ বছর বয়সেই ক্যারিয়ারের ইতি টানতে হয়েছিল তাঁকে। বোর্নমাউথে তাঁর শুরু, বোর্নমাউথেই শেষ। মাঝে দুই বছর খেলেছিলেন পোর্টসমাউথে। সমর্থকেরা তাঁকে দলে ফেরাতে এতটাই উন্মুখ ছিলেন যে তাঁকে কেনার জন্য গঠন করেছিলেন আলাদা ফান্ড।
ক্যারিয়ার শেষে তাই আর বাইরে যাননি, কোচ হিসেবে সরাসরি যোগ দিয়েছিলেন বোর্নমাউথেই। দুই দফায় দলটির কোচ ছিলেন ১২ বছর। অবশেষে ২০২১ সালে এসে হাউই যোগ দেন নিউক্যাসলে। তখন ১৯তম অবস্থানে হাবুডুবু খাচ্ছে নিউক্যাসল। একদিকে বিশাল টাকার জোগান, অন্যদিকে অবনমনের শঙ্কা—এক মৌসুম কোচিং থেকে বিশ্রাম নেওয়া এডি হাউইর সামনে তখন কঠিন পরীক্ষা।
নিউক্যাসলে তখন বইছে সৌদির সুবাতাস। প্রায় তিন বছর ব্রিটিশ সরকার আর সৌদি আরবের টানাপোড়েনের পর নিউক্যাসলের মালিকানা বুঝে পায় সৌদি পাবলিক ফান্ড। সৌদির বিশাল টাকা দেখে অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন, এই বুঝি নামীদামি তারকাদের ঢল নামল বলে। কিন্তু না, বড় তারকা নয়, বরং দল হিসেবে নিজেদের তৈরি করেছে নিউক্যাসল। আর তার পেছনে যোগ্য নাবিকের দায়িত্ব পালন করেছেন এডি হাউই। বোর্নমাউথের হয়ে দল সামলানোর অভিজ্ঞতাটা বেশ আছে তাঁর। ফলে নিউক্যাসলকে গোড়া থেকে গড়তে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।
একে একে দলে ভিড়িয়েছেন আলেকজান্দার ইসাক, নিক পোপ, কেইরান ট্রিপিয়ার, সান্দো তোনালি, অ্যান্থনি গর্ডন, ব্রুনো গুইমারেস, হার্ভি বার্নসের মতো তারকাদের। দু–একজন বাদে দলে ভেড়ার আগে কেউই বড় কোনো তারকা ছিলেন না। ফুটবল–দুনিয়ার কথা হিসাব করলে তাঁদের কেউই এখন বড় তারকা হয়ে ওঠেননি। কিন্তু নিউক্যাসলের ফরম্যাটে এসে বদলে গিয়েছেন সবাই। একঝাঁক তরুণ তারকাকে খুঁজে এনেছেন হাউই। পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ম্যাগপাই সিস্টেমের সঙ্গে। আর তার ফল মিলছে প্রতি মৌসুমে। দ্বিতীয় মৌসুমেই কারাবাও কাপের ফাইনাল, সঙ্গে ২০ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগ। সৌদিদের টাকা ঠিকঠাকভাবেই কাজে লাগাচ্ছেন। সঙ্গে বুঝে পেয়েছেন ভক্তদের ভালোবাসাও।
শেষ যেবার ইংল্যান্ডে কোনো শিরোপা জিতেছিল নিউক্যাসল, তখন বাংলাদেশ নামের কোনো দেশের অস্তিত্ব ছিল না। চালু হয়নি চ্যাম্পিয়নস লিগও। ১৯৫৫ সালের এফএ কাপ ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটিকে হারিয়ে শেষবারের মতো শিরোপার দেখা পেয়েছিল নিউক্যাসল। সেই শেষ। সাত দশক পেরিয়ে গেলেও শিরোপার স্বাদ পাওয়া হয়নি তাদের। ট্রফি ক্যাবিনেটে জমেছে ধুলা, অপেক্ষার পারদ বেড়েছে প্রতি মুহূর্তে। সেই অপেক্ষার শেষ হলো মার্চের এক উষ্ণ রাতে, এডি হাউইর হাত ধরে।
দুই মৌসুম আগে যখন চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলার টিকিট পেয়েছিল ম্যাগপাইরা, সেদিন ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ ধরা দিয়েছিলেন ক্যামেরার পর্দায়। বলেছিলেন, জিতি কিংবা হারি, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই। এ এক নতুন শুরু। সেই শুরুর সঙ্গে আছি। ৬০ বছর ধরে নিউক্যাসল মিশে আছে আমার রক্তে, তাদের এত সহজে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কে জানে, সেই বৃদ্ধ এখন কোথায় আছেন। হয়তো মাঠে, নইলে টিভি পর্দার সামনে। জীবদ্দশায় কখনো শিরোপার দেখা না পাওয়া বৃদ্ধের অশ্রুই প্রমাণ, ফুটবল বোধ হয় জীবনের চেয়েও বড় কিছু।