উড়তে না জানা ছেলেটা (তৃতীয় পর্ব)

অলংকরণ: আরাফাত করিম

রাফিন আবার উঠল গাছে। এবার অন্য একটা ডাল থেকে আবার ঝাঁপ দিল। এবারও বাবা তাকে ধরে ফেলল। তারপর আবার আবার এবং আবার...।

সপ্তমবার যখন ঝাঁপ দিল, তখন একটা অদ্ভুত কাণ্ড হলো। ঠিক মাঝখানে শূন্যে আটকে গেল রাফিন। যেন শূন্যে অন্য কেউ তাকে ধরে ফেলেছে। বাবা চিত্কার করে উঠল আনন্দে।

‘হয়েছে! হয়েছে!!’

হতভম্ব রাফিন হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে বাবাকে বলল, ‘বাবা, আমি কীভাবে আটকালাম? কে আমাকে শূন্যে ধরে রেখেছে?’

‘কেউ তোকে ধরে রাখেনি। ভেবে বল তো, কে তোকে মাঝখানে আটকে রেখেছে?’

‘আমি বুঝতে পারছি না।’

‘পারবি। গভীরভাবে চিন্তা কর।’

রাফিনের মাথার ভেতর দশ মিলিয়ন নিউরনের একটা বিরাট অংশ যেন সিন্যাপস কানেকশন করে একসঙ্গে চিন্তা করতে শুরু করল। কেন শূন্যে আটকাল রাফিন? কেন আটকাল? কেন আটকাল?

ফিরে যেতে যেতে বিষয়টা ব্যাখ্যা করলেন বাবা।

‘বুঝলি, তুই যে শূন্যে ভেসে ছিলি, এখানেও বিজ্ঞান, কোনো ম্যাজিক নেই।’

‘আচ্ছা বাবা, তুমি এত বিজ্ঞান জানো কীভাবে?’

‘কারণ, একসময় আমি কলেজে বিজ্ঞান পড়াতাম।’

‘কোন কলেজে?’

‘ঢাকার একটা কলেজে।’

‘এখন পড়াও না কেন?’

‘সে অনেক কাহিনি। এগুলো তোর না জানলেও চলবে।’

‘হ্যাঁ, এবার তাহলে বলো। কী হয়েছিল আমার? আমি কেন শূন্যে আটকে গেলাম?’

‘আমরা এই পৃথিবীর মানুষেরা আসলে চতুর্থ মাত্রার প্রাণী।’

‘চতুর্থ মাত্রা মানে?’

‘মানে, আমাদের মানুষদের দৈর্ঘ্য আছে, এটা একটা মাত্রা। প্রস্থ আছে, এটা আরেকটা মাত্রা, উচ্চতা আছে, এটা আরেকটা মাত্রা। তার মানে আমাদের তিনটা মাত্রা।’

‘কিন্তু তুমি যে বললে চারটা মাত্রা?’

‘৪ নম্বর মাত্রাটা হচ্ছে সময়। তার মানে আমরা চার মাত্রার প্রাণী। এখন ধর, আমাদের মাত্রা যদি আরেকটা বেড়ে যায়। তাহলে কী হবে?’

‘কী হবে?’

‘তাহলে অদ্ভুত একটা ব্যাপার হবে।’

‘সেটা কী?’

‘তখন আমরা সময়কে আগপিছ করতে পারব। এখন সময়কে অতিক্রম করে আমরা শুধু সামনের দিকে যাচ্ছি, সময়কে পিছে নিতে পারছি না। তখন কিন্তু সময়কে সামনে পিছে নিতে পারব।’

‘কী রকম?’

‘ধর, তুই স্কুলে গেলি, গিয়ে দেখলি তোর ক্লাসের দরজায় তালা মারা। তুই চতুর্থ মাত্রার প্রাণী হলে তোকে অপেক্ষা করতে হবে। স্কুলের দপ্তরি এসে তালা খুলবে, তারপর তুই ঢুকতে পারবি ক্লাসে। কিন্তু তুই যদি পঞ্চম মাত্রার প্রাণী হোস, তাহলে তোকে তালা খুলতে হবে না। তুই এমনিই ঢুকতে পারবি।’

‘সেটা কীভাবে?’

‘ওই যে বললাম, পঞ্চম মাত্রার প্রাণীরা সময়কে আগুপিছু করতে পারে। তোর ক্লাসের দরজাটা যখন খোলা ছিল, সময়কে ওই জায়গায় নিয়ে পঞ্চম মাত্রার রাফিন ঢুকে গেছে। বুঝেছিস?’

রাফিন বুঝেছে কি না, বোঝা গেল না। তারা ততক্ষণে নদীর ধারে চলে এসেছে। সেই আগের জায়গাটা, যেখান দিয়ে তারা হেঁটে নদী পার হয়েছিল। বাবা বললেন,

‘রাফিন?’

‘বলো বাবা।’

‘এবার কিন্তু তুই হেঁটে নদী পার হবি, আমি তোর পিছে পিছে হেঁটে আসব। পারবি না?’

পারব না বলতে গিয়েও হঠাৎ করে রাফিন বলল, ‘পারব।’

সেই দিন থেকেই কেন যেন রাফিন হঠাৎ করে অনেক কিছু বুঝতে শুরু করেছে। যেন সে পাঁচ মাত্রার একটা মানুষ। এই গ্রহের কেউ না। সে প্রয়োজনমতো সময়কে আগপিছ করতে পারে।

তারপর অনেক দিন গেছে। সেভেন থেকে এইটে উঠেছে রাফিন। পরের বছর নাইনে উঠতে যাবে, তখন এক গভীর রাতে বাবা তাকে ডেকে পাঠালেন। বাবা শুয়ে ছিলেন। বললেন,

‘রাফিন।’

‘বলো বাবা, এত রাতে ডাকলে কেন?’

‘গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার জন্য রাতই উত্তম। বস, আমার পাশে বস।’ রাফিন বসল।

‘পারবি না?’

‘কী পারব?’

‘এত দিন যা যা শিখলি আমার কাছ থেকে।’

‘পারব।’

‘ভেরি গুড।’

‘তোর কোনো প্রশ্ন থাকলে আমাকে করতে পারিস।’

‘আচ্ছা বাবা, তুমি বলেছিলে আমরা চার মাত্রার প্রাণী। পঞ্চম মাত্রায় গেলে আমরা আরও অনেক কিছু পারি। কিন্তু পঞ্চম মাত্রাটা আসলে ঠিক কী?’

চলবে সংশোধনী: এই উপন্যাসটির নাম কিশোর আলোর মার্চ সংখ্যায় 'উড়তে জানা ছেলেটা' লেখা হয়েছে। অনাকাঙ্খিত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত।

আরও পড়ুন