আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে হাজারটা ঘুড়ি

বাড্ডার নতুন বাসাটা সাইফের খুব পছন্দ হয়েছে। এমনিতে নতুন কিছু নেই। আগের মতোই তিন রুমের বাসা। একটা ঘরে মা–বাবা। সাইফের জন্য ছোট একটা ঘর। মাঝখানে খাবার ঘর। আর একটা ঘর রাখা অতিথিদের জন্য। ওদের বাসায় প্রায়ই অতিথি আসে। কখনো দাদু, কখনো মামা, কখনো মেজ চাচা। বড় চাচা থাকেন আমেরিকায়। সেখানে একটা বড় কোম্পানিতে চাকরি করেন। মেজ চাচা পড়াশোনা করেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছুটিতে কখনো আসেন। তবে সাইফের ভালো লাগে দাদু এলে।

আলফাজ উদ্দিন মৃধা সাইফের দাদুর নাম। নামটা শুনলেই হি-ম্যান মনে হয় সাইফের। তার প্রিয় কার্টুন। নিয়মিত হি-ম্যান দেখা চাই ওর। কিন্তু দাদু হি-ম্যানের মতো বড়সড় মানুষ নন। উচ্চতা ঠিকঠাক, কিন্তু বেশ শুকনো–পাতলা লোকটা। সাইফের বিশ্বাস হয় না যে এই লোক পুলিশের দারোগা ছিলেন।

কিন্তু আসলে তো ছিলেন। ফরিদপুরেই পোস্টিং ছিল দাদুর জীবনের বড় একটা সময়। তার আগে চট্টগ্রামে। সেখানেই চাকরি শুরু করেছিলেন। কিন্তু ফরিদপুরে অনেক জমিজমা থাকার কারণে সেখানে পোস্টিং নিয়ে এসেছিলেন। চল্লিশ বছরের চাকরিজীবনে চোর-ডাকাত কম ধরেননি। সেই সঙ্গে আছে ভৌতিক নানা অভিজ্ঞতা। ঢাকায় এলে রাত জেগে দাদুর কাছ থেকে সেসব গল্প শোনে সাইফ। তবে এবার দাদু এলে একটা ভিন্ন কাজ করবে। বাড্ডার বাসাটা এ কারণেই তার পছন্দ হয়েছে।

ছয়তলা দালানের ওপর সাততলায় ছাদ। ব্যাপারটা সাইফের ভালো লেগেছে। এর আগে উত্তরায় ওরা ছিল একটা দোতলা বাসায়। সেখানে দূর দূর পর্যন্ত বড় কোনো দালান ছিল না। মাঠ ছিল, কিন্তু মাঠে ক্রিকেট খেলা যায় না সব সময়। কেউ ছাগল চরায়, কেউ বেড়া দিয়ে রাখে। আর মাঝেমধ্যে খারাপ ছেলেরা আড্ডা দেয়।

খারাপ ছেলে বিষয়টা অবশ্য বোঝে না সাইফ। তবে মা বলে ওদের খারাপ ছেলে। আসলে তার মা জোহরা মনে করেন, উত্তরার এই আধা গ্রাম্য এলাকার বেশির ভাগ ছেলে বখাটে। কিছু না হলেও অন্তত সিগারেট এরা খায়। এ কথা একেবারে মিথ্যা নয়। সৌরভ এখন ক্লাস নাইনে পড়ে। কিন্তু ওকে স্কুলে যেতে দেখে না সাইফ। ক্রিকেট, আড্ডা আর সাইকেল রেস করেই তার সময় কাটে। উত্তরায় থাকলে সাইফের পড়াশোনা হবে না বলে মনে করেছিলেন জোহরা। তাই বাড্ডায় সরে আসা।

আরও পড়ুন

সাইফের বাবা রবিউল ইসলাম। সোনালী ব্যাংকে চাকরি করেন। সঙ্গে ছোট একটা ব্যবসাও আছে। ঢাকায় এসে কিছুদিন চাকরি করার পর নিজের জমানো টাকা আর বাবার কাছ থেকে কিছু নিয়ে উত্তরায় জমি কিনেছিলেন খানিকটা। এরপর বিয়ে, সাইফের জন্ম, তাকে পড়ানো। জমিতে একটা টিনশেড তুলেছিলেন, কিন্তু সেখানে থাকেননি। উত্তরা ছাড়ার ইচ্ছা তাঁরও ছিল।

গুদারা ঘাট থেকে তিন মিনিট উত্তরে হাঁটলে ‘অন্তরা’ নামের দালান। তারই চারতলায় সাইফদের বাসা। প্রথম দিন ও আর মা এসেছিল একটা বেবিট্যাক্সিতে করে। ওহ্‌, না! বেবিট্যাক্সি তো দুই বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। এখন বলে সিএনজি। সবুজ রঙের একটা খাঁচা। সাইফের ভালো লাগে না। প্রচণ্ড শব্দে কানে তালা লাগে ওর। তবু বাবা ওকে ট্রাকে করে আনতে চাননি। কিন্তু সাইফের খুব ইচ্ছা ছিল খোলা ট্রাকের ওপর বসে আকাশ আর শহর দেখবে।

আকাশ খুব ভালো লাগে সাইফের। উত্তরার বাসার ছাদে বসে সে আকাশ দেখত। কিন্তু মনে হতো, আকাশটা বহুদূরে। বড় চাচা একবার ওকে বলেছিলেন, আমেরিকায় অনেক উঁচু দালান আছে। কিন্তু ফরিদপুরের মাঠ থেকে আকাশ যতটা কাছে মনে হয়, আমেরিকার ত্রিশ তলা উঁচু দালান থেকে ততটাই দূরে মনে হয়।

কেবল ক্লাস ফোরে উঠেছে সাইফ। আলতাফ চাচার এত কঠিন কথা সে বোঝে না। টিভিতে দেখেছে রঙিন সেই দেশ, সেই শহরের ছবি। তার মনে হয়, কী চমৎকারই না সেই শহর! নিউইয়র্ক, ম্যানহাটান। ফরিদপুরের মতো না। উত্তরার মতোও না। সে জন্যই হয়তো বাড্ডায় এসে কয়েকটা উঁচু দালান দেখে মনে হয়েছিল, রঙিন শহরে এসেছে সে। আর এ বাসায় ওঠার পর সন্ধান পায় এক নতুন রঙের।

চারতলায় ওদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকে ইফাত। ক্লাস সিক্সে পড়ে। ইফাতই তৃতীয় দিন ওকে টেনে নিয়েছিল ছাদে। সেখানেই পরিচয় হয়েছিল আকাশ, সাহিদ, প্রিয়ম, শশী আর নাবিলের সঙ্গে। সাততলার ছাদে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় ওদের আড্ডা বসে। কোনো দিন লুডু নিয়ে, কোনো দিন ক্যারম। তবে শীতের সময়টা এসব কিছুই না। সবাই মেতে থাকে ঘুড়ি নিয়ে। রংবেরঙের ঘুড়ি।

‘অন্তরা’র আশপাশে আরও বেশ কিছু উঁচু দালান আছে। তবে সেগুলোর প্রতিটির নাম নেই। তবে রং আছে। দক্ষিণে সায়েমরা যে বাড়িতে থাকে, ওটার বাইরে ছাই রং। দক্ষিণে তিন্নিদের বাড়ির রং নীল। গোলাপি কোনো বাড়ি নেই বলে জুলির আফসোস।

রোববার বিকেলে সেই আফসোস শুনে সাহিদ বলে, ‘আরে বাড়ির রং গোলাপি না হলে কী সমস্যা? তুই ঘরের রং গোলাপি করে নে।’

তাতে অবশ্য কোনো ভাবান্তর হয় না তিন্নির। তার মনে হয়, বাড়ির বাইরের রংটাই বেশি টানে। ওরা নাকি একবার পদুচেরি গিয়েছিল। সেখানে এত উঁচু উঁচু দালান নেই। ছোট ছোট সাজানো–গোছানো বাড়ি। একেক বাড়ির একেক রং।

তবে বাড়ির রং অনেক না হলেও ওরা ঠিক করেছে যে এবার ঘুড়ির রং হবে অনেক। গত বছর ‘অন্তরা’র ছেলেমেয়েরা ঘুড়ি ওড়ানোতে বাড্ডায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। আশপাশের চল্লিশ দালানের কেউই পারেনি ওদের হারাতে। এর অন্যতম কারণ ছিল জামিল। সে চমৎকার মাঞ্জা দিতে পারত। মাঞ্জা দেওয়া সুতায় নিজের হাতও কেটেছে অনেকবার। কিন্তু জামিল থামত না। ঘুড়ি কখন ঢিল দিতে হয়, কখন সুতা টানতে হয়, ওর মতো করে কেউ জানত না।

জামিল নেই। হুট করে ডেঙ্গু হয়ে মারা গেছে। যাওয়ার আগে হাসপাতালে বসেও সাহিদকে নাকি বলেছে অন্তরার সবার মধ্যে যেন ওর ঘুড়িগুলো ভাগ করে দেয়। দুটো নাটাইয়ের একটা নেবে সাহিদ, আরেকটা প্রিয়ম। পরের বছর ওদেরই কেটে নিতে হবে অন্যদের সব ঘুড়ি।

আরও পড়ুন

জামিলের কথা মনে রেখেছে ওর বন্ধুরা। আর কেন যেন মনে হয়, এবার জামিলের জায়গাটা নেবে আকাশ। সে–ও কিছুদিন হয় ঘুড়ি ওড়াতে জান লড়িয়ে দিচ্ছে।

‘আকাশের চোখ হলো আকাশেরই মতো। চারদিকে দারুণ দেখে। ওর ঘুড়ির কাছে কাউকে আসতেও দেয় না’, বলে প্রিয়ম। ওর দিকে তাকিয়ে কথা গিলতে থাকে সাইফ। ওর হাতে একটা কমলা রঙের ঘুড়ি।

প্রিয়মের কথা শেষ না হতেই সাহিদ বলে, ‘আর একবার যদি আসে, সুতায় প্যাঁচ দিয়ে দুই মিনিটের মধ্যে ওটা কেটে ফেলবে।’

সাইফ ঘুড়ি ওড়াতে পারে, কিন্তু বন্ধুদের কথা শুনে বুঝতে পারে, এত দক্ষ হতে ওর বহু সময় লাগবে। তবে ও ঘুড়ি বানাতে পারে। উত্তরায় বসে ঘুড়ি বানিয়েছিল কিছু। তারপর গত শীতে দাদুর আগমন।

সাইফের বানানো একটা ঘুড়ি তুলে হেসেছিলেন দাদু। বলেছিলেন, ‘কাঁচা কাজ হইছে দাদাভাই। তবে তোমার হাতের কাজ ভালো। আসো, তোমারে ঘুড্ডি বানানো শিখাই।’

একটা সাধারণ ঘুড়িই বানিয়েছিলেন দাদু। তবে দেখিয়েছিলেন, মাঝখানের কাঠিটা বসানোর একটা কৌশল আছে। সেই সঙ্গে বলেছিলেন ঘুড়ির ইতিহাস। চীন দেশেই নাকি প্রথম ঘুড়ি তৈরি হয়েছিল। পাখির ওড়া দেখে চীনারা এমন কিছু বানাতে চেয়েছিল, যা আকাশে উড়তে পারে। ঘুড়ি দিয়ে আসলে মানুষ নিজেদের আকাশে ওড়ার ইচ্ছা পূরণ করে। সাইফের দাদুর অন্তত তা–ই মনে হয়।

সাইফ এবার চারটা ঘুড়ি বানাচ্ছে ‘অন্তরা’র জন্য। একটা ইগলের মতো, একটা ড্রাগনের মতো। বাকি দুটো সাধারণ ঘুড়ি কিন্তু তাদের আছে দীর্ঘ লেজ। তার মধ্যে একটা প্রায় চার ফুট।

সবশেষে ওড়ানো হলো ইগল। ছাড়ার পরই তরতর করে উড়তে শুরু করল আর আকাশে চড়ে বেড়াতে লাগল। সাইফের হাতে নাটাই নেই। সে কেবল এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে। ইগলের নাটাই আকাশের হাতে। ড্রাগনেরটা প্রিয়মের। সাহিদ ওড়াচ্ছে চার ফুট লেজওয়ালা ঘুড়িটা।

আরও পড়ুন

তিন্নিদের বাড়ি থেকে ওড়ানো হয়েছে সাপের মতো একটা ঘুড়ি। কালো–সোনালি ছোপওয়ালা ঘুড়িটা সাপের মতোই চলছে। মনে হচ্ছে আকাশটা হয়ে গেছে জলাশয় আর সেখানে জলবাসী কোনো সাপ এঁকেবেঁকে চলছে।

আকাশের কী হয়েছে কে জানে। আজ তার হাত কাঁপছে। যেন সাপের মতো দেখায় সে বিহ্বল। সাপটা পেঁচিয়ে ধরার চেষ্টা করছে ইগলটাকে। আর ইগল ছাড়াতে চাচ্ছে সাপকে। ঠোকর মারছে একবার। সাপের সুতোয় প্যাঁচ কষতে চাচ্ছে আকাশ।

এদিকে সাইফ তাকিয়ে দেখে, আকাশজুড়ে হাজার রঙের ঘুড়ি উড়ে বেড়াচ্ছে। সব রং সে চেনেও না। কিছু ঘুড়ি এত ওপরে উঠেছে যে সেগুলোর রং, চেহারা কিছুই বুঝতে পারছে না সাইফ। তবে তার মনে হচ্ছে এই আকাশ রাতের আকাশের তুলনায় আলাদা। ঘুড়িগুলো যেন আকাশের বুকে নানা রঙের তারা হয়ে ফুটে আছে। প্রতিটা দালান থেকে ওড়ানো ঘুড়িগুলো নিয়ে তৈরি হয়েছে একেকটা গ্যালাক্সি।

ঘোরের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল সাইফ। তারপরই হুট করে শুনল, ‘ভোওওক্ককাট্টা...’

চিৎকার দিয়েছে প্রিয়ম। সাপ কেটে গেছে আকাশের সুতোয়। সাপকে পরাজিত করেছে সাইফের ইগল। আকাশ, সাহিদ, প্রিয়ম, নাবিল এসে জড়িয়ে ধরল সাইফকে।

সাইফ তাকিয়ে দেখল, তিন্নিদের বাড়ির ওপর থেকে সবাই তাকিয়ে আছে ওদের ছাদে। কোনো বিদ্বেষ নেই কারও চোখে। যেন ওরাও জিতেছে।

আর তখনো আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে হাজারটা ঘুড়ি। সেখানে তাকিয়ে সাইফ বুঝল, এই আকাশটা তার খুব কাছে।

আরও পড়ুন