উড়তে না জানা ছেলেটা (প্রথম পর্ব)

অলংকরণ: আরাফাত করিম

স্কুলটার নাম ‘শহীদ বাবুল হাইস্কুল’। রাফিন দশ মিনিটের ওপর স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে আছে। দারোয়ান ঢুকতে দিচ্ছে না। তার কথা একটাই—এই স্কুলের গেট দশটা দশে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আর খোলে না। একবারে চারটায় স্কুল ছুটির পর খুলবে, তার আগে না।

‘কিন্তু আমি নতুন, এখানে ভর্তি হতে এসেছি। আমাকে বলা হয়েছে সাড়ে দশটায় আসতে।’

‘কে বলছে?’

‘বলেছেন রকিবুল স্যার।’

‘ওই সব বুঝি না। আজ হবে না।’ বলে দারোয়ান তার গোঁফ মোচড়ায়। দারোয়ানের গোঁফটা বেশ পাকানো।

‘তাহলে ঢুকতে দেবেন না?’

‘না।’

‘কিন্তু আমি ঢুকবই...’

দারোয়ান কড়া চোখে তাকাল, ভাবটা এমন যে দেখি না ক্যামনে ঢোকো তুমি। রাফিন এদিক–ওদিক তাকাল, তারপর স্কুলটা ঘিরে একটা চক্কর দিল। স্কুলটা তার পছন্দ হয়েছে। স্কুল পছন্দ হওয়ার কারণ, যার নামে স্কুল, তিনি একজন কঠিন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, শেষ মুহূর্তে ধরা পড়ে যান। পরে নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। শহীদ বাবুল ছোট চাচার বন্ধু ছিলেন। কিন্তু মনে হচ্ছে স্কুলের দারোয়ানটা সুবিধার নয়। তবে রাফিনকে স্কুলে ঢুকতেই হবে, সেটা যেভাবেই হোক...বাই হুক অর কুক। স্কুলের পেছনে এক জায়গায় দেয়ালের পাশ ঘেঁষে একটা আমগাছ দেখতে পেল। সেটা বেয়ে তরতর করে উঠে পড়ল রাফিন। তারপর দেয়াল টপকে একলাফে স্কুল কম্পাউন্ডে। কেউ দেখতে পেল না।

১০১ নম্বরে রকিবুল স্যারের রুম খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না রাফিনের। মনে হচ্ছে, তিনি আসলে অফিস কর্মকর্তা। ঠিক স্কুলের শিক্ষক মনে হচ্ছে না। শিক্ষক হলে নিশ্চয়ই এই সময় ক্লাসেই থাকতেন।

‘তুমি রাফিন। পুরো নাম কী?’

‘রাফিন রিয়াজ।’

‘এই নামের অর্থ কী?’

‘উড়ন্ত বাজপাখি।’ আসলে রাফিন রিয়াজের নামের অর্থ মোটেই উড়ন্ত বাজপাখি নয়। রকিবুল স্যারের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, তিনিও ওই দারোয়ানের মতোই বিরক্ত। কপালের ওপর বিছার মতো দুটো ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন রাফিনের দিকে। তাঁকে যদি বলে নামের অর্থ জানে না, তাহলে এই স্যার আরও বিরক্ত হবেন। নামের অর্থ শুনে মুখ বাঁকালেন—বিড়বিড় করে বললেন,

‘এহ্‌! উড়ন্ত বাজপাখি।’

‘আগের স্কুলের ট্রান্সফার সার্টিফিকেট আনছ?’

‘এই যে স্যার।’

‘ভর্তি ফি আনছ?’

‘জি স্যার।’

স্যার টাকা নিয়ে কাগজপত্রে হাবিজাবি কী সব লিখলেন অনেকক্ষণ ধরে, তারপর একটা কাগজ বাড়িয়ে ধরলেন।

‘যাও, ১০৫ নম্বর রুমে গিয়ে হেডস্যারের কাছ থেকে সাইন নিয়ে আসো।’

‘জি স্যার।’

১০৫ নম্বর রুমটা বেশ বড়। হেডস্যার বসে আছেন। তাঁর সামনে বসে আছেন আরও দুজন। হেডস্যারের চেহারাটা অনেকটা হিটলারের মতো। নাকের নিচে বাটার ফ্লাই গোঁফ। একগোছা চুল কপালে এসে পড়েছে। পুরাই হিটলার।

‘মে আই কাম ইন স্যার?’

হেডস্যার ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। যদিও তার কপালে কোনো ভ্রু নেই।

‘কী ব্যাপার?’ স্যারের গলাটা মেয়েদের মতো।

‘স্যার, ভর্তি হবো। আপনার সাইন লাগবে।’ রাফিন কাগজটা বাড়িয়ে দিল।

স্যার মনোযোগ দিয়ে কাগজটা পড়লেন। তারপর মাথা নাড়লেন।

‘না, এভাবে তো আমি ভর্তি করাব না। পরীক্ষা দিতে হবে আগে।’

‘ঠিক, ঠিক। এভাবে এমনি এমনি এই স্কুলে ভর্তি করাই না আমরা।’ সামনে বসা দুজনের একজন মন্তব্য করল। হেডস্যার বেল বাজালেন। একজন পিয়ন ছুটে এল।

‘স্যার?’

‘এই ছেলেকে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নটা দাও। আর খাতা দাও।’ পিয়ন দ্রুত একটা প্রশ্নপত্র আর খাতা নিয়ে এল, রাফিনের হাতে ধরিয়ে দিল। হেডস্যার কোনায় একটা টেবিল–চেয়ার দেখিয়ে দিলেন।

কী জ্বালা! এখন আবার পরীক্ষা দিতে হবে। আগে তো এমন কথা ছিল না। যা–ই হোক, প্রশ্নপত্রের দিকে নজর দিল রাফিন। তা-ও ভালো, মাত্র তিনটা প্রশ্ন। ১. তোমার স্কুলের ওপর একটা ইংরেজি প্যারাগ্রাফ লেখো; ২. ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণ প্রমাণ করো; ৩. পরিপাকতন্ত্র এঁকে দেখাও।

রাফিনকে খুব খারাপ ছাত্র বলা যাবে না। আগের স্কুলে তার রোল ছিল ৭। এবং সে চাইলে তার রোল নম্বরটাকে এগিয়ে নিয়ে আসতে পারত। কিন্তু সে সব সময় চেষ্টা করেছে রোল ৭ ধরে রাখতে। এটা একটা কঠিন কাজ, কিন্তু রাফিন পেরেছে। মানে পেরেছিল। এই স্কুলে তার রোল কত হয় কে জানে। ১৫ মিনিটের মধ্যে সে পরীক্ষা শেষ করল। হেডস্যার খাতাটা দেখলেন। একবার তার দিকে তাকালেন। তারপর সেই কাগজে সই করলেন। স্যারের সাইনটাও সেই যেন একটা দুই টাকা দামের প্লাস্টিকের চিরুনি কেউ কাগজটার ওপর ফেলে রেখেছে।

কাগজ নিয়ে ১০১-এ এসে সেই রকিবুল স্যারকে দিতেই স্যার মোটামুটি খেঁকিয়ে উঠলেন।

‘একটা সাইন আনতে এত দেরি?’

‘হেডস্যারের রুমে পরীক্ষা দিতে হলো।’

‘এহ্‌ আবার পরীক্ষা।’ এই স্যারটা মনে হচ্ছে হেডস্যারের ওপরও মহাবিরক্ত।

সব লেখালেখি শেষ করে রকিবুল স্যার বললেন, ‘যাও, তিনতলায় ৩০২ নং রুমে যাও। তোমার রোল নং ৩৪।’ রাফিন খুশি হয়ে উঠল ৩ যোগ ৪ সাত। সাত সংখ্যাটা তার সঙ্গে থাকা দরকার, জরুরি।

৩০২ নম্বর রুমের সামনে এসে দাঁড়াল রাফিন। ৩০২-এর নিচে লেখা নবম শ্রেণি। ভেতরে ক্লাস চলছে। দুদিকে বেঞ্চ সাজানো, একদিকে মেয়েরা বসেছে, একদিকে ছেলেরা। স্যার বোর্ডে কিছু একটা লিখছিলেন। রাফিনের দিকে তাকালেন।

‘কী ব্যাপার?’

‘স্যার, আমি এই ক্লাসে ভর্তি হয়েছি।’ স্যার বোর্ডে লেখালেখি বন্ধ করে চেয়ারে বসলেন। রাফিনের হাতের ভর্তির রিসিটটা দেখলেন। তারপর নাম ডাকের খাতায় তার নামটা তুললেন। তারপর বললেন, ‘তুই ক্লাসের মাঝখানে এসে আমাকে বিরক্ত করেছিস। এখানে দাঁড়িয়ে থাক। এটা তোর পানিশমেন্ট।’ বলে স্যার আবার বোর্ডে চলে গেলেন। তিনি বোর্ডে জ্যামিতির কি একটা উপপাদ্য বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন।

কী আর করা, প্রথম দিনেই পানিশমেন্ট। স্যারের দেখানো জায়গাটায় দাঁড়িয়ে রইল রাফিন। সে খেয়াল করল, ক্লাসের ছেলেমেয়ে সবাই হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে, তারা নিশ্চয়ই মজা পাচ্ছে। কী আর করা, রাফিনও মুখটাকে একটু হাসি হাসি করে ওদের খেয়াল করতে লাগল। মিনিট দশেক পর স্যার বললেন বসতে। শেষ বেঞ্চে জায়গা হলো তার। তার পাশের ছেলেটা বেশ লম্বা। তার দিকে তাকিয়ে সে একটা হাসি দিল। কিন্তু ছেলেটা মুখ ভ্যাংচালো বাচ্চাদের মতো করে। রাফিন তার এক পায়ের জুতা খুলে পাশে রাখল। এই পা–টা কেন যেন ঘেমে যায় আগে আগে। আজ হাঁটাও হয়েছে কম নয়। তখনই খেয়াল করল পাশের লম্বা ছেলেটা তার লম্বা পা দিয়ে তার খোলা জুতাটায় একটা লাথি দিল। জুতাটা লাথি খেয়ে সাই করে চলে গেল সামনে। সামনে যেই ছেলেটার কাছে গেল, জুতাটায় সে আবার একটা লাথি দিল। জুতাটা এবার ডান দিকে মানে গেল মেয়েদের দিকে চলে গেল। মেয়েরাও লাথি দিল। বেঞ্চের নিচে নিচে বেশ একটা লাথি লাথি খেলা চলতে লাগল। আর রাফিনের এক পাটি জুতা বেঞ্চের নিচে নিচে ছুটতে লাগল এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে এদিক...একসময় শাঁই করে চলে গেল স্যারের পায়ের কাছে।

স্যার কিছুক্ষণ জুতার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা হুংকার দিলেন!

‘এটা কার জুতা?’

ক্লাসে পিনপতন নিস্তব্ধতা। সবাই চুপ। স্যার এবার দ্বিতীয়বার হুংকার দিলেন, ঠিক হুংকার দিলেন না, চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘আনসার মি! হুজ শু ইট ইজ? অ্যান্ড হু ডিড ইট?’

তখন অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। সবাই দেখল জুতাটা উল্টে ছিল, হঠাৎ করে সেটা আপনি আপনি সোজা হলো। তারপর একটা খেলনা গাড়ি ছুটে চলার মতো শাঁই করে বেঞ্চের নিচ দিয়ে রাফিনের পায়ের কাছে চলে এল এবং রাফিন সেটা আস্তে করে পায়ে ঢুকিয়ে নিল। ব্যাপারটা সবাই চট করে বুঝতে পারল না। রাফিন এবার তাকাল পাশের লম্বা ছেলেটার দিকে। ছেলেটা হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ঢোক গিলল দুবার। রাফিন মনে মনে বলল, ‘টেলিকাইনেসিস।’

চলবে

সংশোধনী: এই উপন্যাসটির নাম কিশোর আলোর মার্চ সংখ্যায় 'উড়তে জানা ছেলেটা' লেখা হয়েছে। অনাকাঙ্খিত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত।

আরও পড়ুন