গল্পের সুবিধার জন্য আমরা বরং একটু পিছিয়ে যাই:
কেশবপুর গ্রামে রশীদ খানকে সবাই এক নামে চিনে। তারা অবশ্য রশীদ খান বলে না। তারা বলে রশীদ জাদুকর। এই গ্রামে অবশ্য অনেকগুলো রশীদ আছে। তবে জাদুকর রশীদ বললে সবাই দেখিয়ে দেয়, ‘ওই যে তালগাছটা, তার নিচে একটা পুকুর, তার ডান পাশে ঝুপড়ি বাসাটা জাদুকর রশীদের।’
রশীদ জাদুকর একাই থাকে। তার স্ত্রী চলে গেছে সন্তান রাফিনের জন্মের পরপর। জাদুকর রশীদ ভেবেছিল, স্ত্রী বোধ হয় ছেলেকে নিয়ে যেতে চাইবে, কিন্তু চায়নি, একাই চলে গেছে। রশীদ মাঝেমধ্যে ভাবে, চলে যাবেই না কেন? কোনো স্ত্রী যদি গভীর রাতে দেখে তার স্বামী দুই দিকে দুই হাত ছড়িয়ে শূন্যে ভাসছে, তাহলে কেমন লাগবে?
ভয়ংকর সব ম্যাজিক জানত রশীদ। এখনো যে জানে না তাইবা কে বলবে? কিন্তু এখন সে ঝিমিয়ে পড়েছে। কোথাও যায় না। কেউ বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে বায়না করতে এলেও যায় না। তার ছেলে রাফিন যখন আবদার করে
‘বাবা একটা জাদু দেখাও না।’
বাবা চুপচাপ মাথা নাড়ে। তবে একদিন বাবা হঠাৎ বলল, ‘তুই জাদু শিখবি?’
‘না।’
‘কেন?’
‘ভয় লাগে।’ বাবা হেসে ওঠে, ‘ধুর বোকা, জাদু আসলে বিজ্ঞান। এখানে ভয়ের কিছু নেই।’
‘কিন্তু তুমি যে বলেছিলে একটা ভূত ম্যাজিক দেখানোর সময় তোমার সঙ্গে থাকে?’ হা হা হা করে হেসে বাবা বলে,
‘আরে বোকা, জাদুকরদের কিছু মিথ্যা সব সময়ই বলতে হয়। আর মিথ্যা বলতে হয় সত্যের মতো করে।’
তারপর সত্যি সত্যি যেদিন রাফিন বাবার ম্যাজিক শিখতে রাজি হলো, সেদিন থেকেই শুরু হলো তার ট্রেনিং। প্রথম ট্রেনিংটা ছিল বেশ কঠিন, রাফিনের এখনো মনে আছে । রাফিনের বয়স তখন আর কত? ক্লাস ফোরে পড়ে। বাবা তাকে নিয়ে চলে গেলেন নদীর ধারে। তাদের গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া গাঙ্গুনী নদী। নদীর পারের বিশেষ একটা জায়গায় এসে দাঁড়ালেন বাবা। বললেন,
‘আমি এখন এই নদীটা হেঁটে পার হব।’
‘কী বলছ?’
‘তুই আমাকে অনুসরণ করবি। আমি ঠিক যেখানে যেখানে পা দেব, ঠিক সেখানে সেখানে পা দিবি।’
‘বাবা ভয় করছে।’
‘ভয়ের কিছু নেই।’
‘যদি ডুবে যাই?’
‘সাঁতরে উঠবি, সাঁতার জানিস না?’
‘জানি।’
‘তাহলে আর ভয় কী? আর আমি তো তোর সামনেই আছি। চল, মনে আছে তো, আমি ঠিক যেখানে যেখানে পা দেব, তুই সেখানে সেখানে পা দিবি।’
আর কী আশ্চর্য! রাফিন ঠিক ঠিক বাবার পিছু পিছু নদীটা হেঁটে পার হয়ে গেল। নদীটা অবশ্য খুব চওড়া নয়। হয়তো ২০০ গজ হবে কিংবা ৩০০ গজ।
‘বাবা, এটা কীভাবে হলো?’
‘ম্যাজিক।’
‘তুমি বলেছ, প্রতিটি ম্যাজিকের পেছনে বিজ্ঞান আছে। এটার পেছনে বিজ্ঞানটা কী?’
‘বলছি, আয় এখানে বসে আগে একটু বিশ্রাম নিই।’
তারা দুজন একটা গাছতলায় বসল। বিশাল গাছটা অনেক জায়গাজুড়ে ছায়া দিচ্ছে। আর নদীর দিক থেকে ছুটে আসছে দক্ষিণের ফুরফুরে বাতাস। বাবা বলতে শুরু করলেন।
‘নদীর যে জায়গাটা দিয়ে আমরা হেঁটে পার হলাম, এই জায়গাটা আমাকে খুঁজে বের করতে আট বছর লেগেছে। তুই হাঁটার সময় পায়ের নিচে কিছু টের পাসনি?’
‘পেয়েছি, নরম নরম।’
‘তাকিয়ে দেখিসনি?’
‘না, ভয় করেছে।’
‘ওটা আসলে একধরনের প্রবাল। প্রবাল সাধারণত সমুদ্রের গভীরে দেখা যায় কিন্তু এই বিশেষ প্রবালটা হঠাৎ হঠাৎ নদীতেও দেখা যায়। এরা গাছের মতো ডালপালা ছড়িয়ে থাকে নদীর গভীরে। ঠিক দেখা যায় না। আবার খেয়াল করলে দেখা যায়। তুই আসলে নদীর নিচের একটা অদ্ভুত গাছের ডালে পা দিয়ে আমার পিছে পিছে এসেছিস।’
‘এটাই বিজ্ঞান?’
‘হ্যাঁ, এটাই বিজ্ঞান। এই বিশেষ গাছটা সম্পর্কে জানাই বিজ্ঞান। সবাই জানে না। আমি জানি।’
‘তুমি কীভাবে জানলে?’
‘সেটা পরে জানলেও চলবে। চল এবার তোকে শূন্যে ভেসে থাকা শেখাব। এটা যদি শিখতে পারিস বা বুঝতে পারিস, তাহলে ম্যাজিকের অর্ধেক তুই শিখে গেলি।’
‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ, একদম সত্যি।’
ঘণ্টাখানেক হেঁটে তারা একটা জঙ্গলের কাছে চলে এল।
‘আয়, এখানে বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিই।’ বাবা তার ঝোলা খুলে কয়েকটা নারকেলের নাড়ু বের করলেন।
‘নে, খা।’
বেশ ক্লান্ত লাগছিল রাফিনের; নারকেলের নাড়ু কয়েকটা খেয়ে মনে হলো বেশ শক্তি হলো গায়ে। বাবা পানি বের করে দিলেন। পানি খেল রাফিন।
‘কিরে, বিশ্রাম হয়েছে?’
‘হয়েছে।’
‘চল, এবার আরেকটু হাঁটতে হবে আমাদের...আমরা জঙ্গলের আরও গভীরে ঢুকব।’
‘চল।’
কিছুক্ষণ পর তারা একটা গাছের সামনে এসে দাঁড়াল। বাবা তাকালেন রাফিনের দিকে।
‘নে, এবার এই গাছটায় উঠতে থাক।’ রাফিন বাবার কথামতো গাছে উঠতে থাকল। একসময় বাবা চেঁচালেন—
‘ব্যস, ব্যস, আর উঠতে হবে না।’
‘এখন কী করব?’
‘এখন নিচে ঝাঁপ দে।
‘কী বলছ বাবা? আমার হাত–পা ভেঙে যাবে।’
‘যাবে না। আমি তোকে নিচে ধরে ফেলব।’
‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ, সত্যি। ঝাঁপ দে, আমি তোকে ক্যাচ ধরব। তোর কিচ্ছু হবে না।’ সাতপাঁচ না ভেবে ঝাঁপ দিল রাফিন। কিছুক্ষণের জন্য যেন সে একটা পাখি হয়ে গেল। ঝপ করে বাবা কীভাবে যেন তাকে ঠিক ধরে ফেলল।
‘নে, আবার উঠ।’
‘আবার?’
‘হ্যাঁ, আবার, এবার অন্য জায়গা থেকে ঝাঁপ দিবি। অন্য ডাল থেকে।’
চলবে
সংশোধনী: এই উপন্যাসটির নাম কিশোর আলোর মার্চ সংখ্যায় 'উড়তে জানা ছেলেটা' লেখা হয়েছে। অনাকাঙ্খিত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত।