ইন্ডোসমেন্ট
রোল কল শেষ। ইংরেজি ক্লাস চলছে। পড়াচ্ছেন সুচিত্র স্যার—বাবু সুচিত্র কুমার দত্ত।
স্যার হাজিরা খাতাটা বন্ধ করতে না করতেই থার্ড বেঞ্চ থেকে শরাফত উঠে দাঁড়াল। ওর এই আকস্মিক গাত্রোত্থানে স্যার কিঞ্চিৎ অবাক।
শরাফত ছাত্র হিসেবে প্রায় মাঝারি (বন্ধুকে এর নিচে নামানো উচিত নয়)। একটু রোগাপটকা শরীর। সপ্তাহে গড়ে তিন দিন পড়া পারে না। নিয়মিত বেতের বাড়ি খায় বলেই স্বাস্থ্যটা ভালো হওয়ার কোনো লক্ষণও নেই।
হঠাৎ দাঁড়ানো শরাফতের দিকে স্যার ভুরু কুঁচকে তাকালেন। লোকে ভাত খেতে বসে যে নিরীক্ষণমূলক দৃষ্টিতে মাছের কাঁটা বাছে, স্যারের তাকানোটাও সেই ধরনের। তারপর সন্দেহমাখা প্রশ্ন ছুড়ে দেন,
‘তোর আবার কী হলো?’
‘একটা বিষয় জানার ছিল, স্যার।’ শরাফতের বিনীত জবাব।
এই বিনীত ভাব দেখেই আমরা আন্দাজ করে নিলাম যে শরাফত আজও পড়া শিখে আসেনি। ক্লাসের শুরুতেই সময় নষ্ট করার ফন্দি এঁটেছে। এর ফলে স্যার পড়া ধরার জন্য সময় কম পাবেন। শরাফত পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই ক্লাস শেষের ঘণ্টা পড়ে যাবে। বুদ্ধিটা আমরাও মাঝেমধ্যে খাটাই। মোটামুটি কার্যকর পদ্ধতি।
স্যার বোধ হয় একটু রেগেছেন। তাতানো গলায় জানতে চাইলেন,
‘একটা বিষয়ে তোর জানার আছে মানে কী? দুনিয়ার বাকি সব বিষয় জেনে ফেলেছিস?’
‘না, মানে, ইংরেজি একটা শব্দের অর্থ জানতে চাই।’ শরাফত আমতা-আমতা করে।
ইংরেজির প্রতি ছাত্রের জ্ঞানপিপাসা দেখে স্যার নরম হয়ে যান।
‘বেশ ভালো। শব্দটা কী রে?’
‘স্যার, ইন্ডোসমেন্ট।’
‘কী বললি? আবার বল।’
‘ইন্ডোসমেন্ট।’
স্যার একটু চিন্তায় পড়ে যান। কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে থাকেন, যেন শব্দটা ডিকশনারিতে খুঁজছেন। তারপর নিরাশ হয়ে চোখ খুলে আবারও প্রশ্ন করেন,
‘শব্দটা ঠিক বলছিস তো? নাকি ওটা ইনভেস্টমেন্ট হবে?’
‘না, না স্যার। ইনভেস্টমেন্ট মানে তো আমি জানি। বিনিয়োগ। কিন্তু আজ সকালেই পেলাম নতুন এই শব্দ, ইন্ডোসমেন্ট।’
‘কোথায় পেলি এই শব্দ?’
‘একটা ব্যাগের মধ্যে লেখা দেখেছি।’
এবার সুচিত্র স্যার, যাঁকে আমরা ‘ইংরেজির জাহাজ’ বলি, সেই স্যারও চিন্তায় পড়ে যান। বিড়বিড় করে বলেন, ‘কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! সারা জীবন এই শব্দ শুনলাম না। ইংরেজি ভাষা কতই না বিস্তৃত!’
তারপর স্যার আমাদের বললেন, ‘নতুন শব্দটা আমাদের এখনই জেনে রাখা উচিত, তোরা কী বলিস?’
‘ঠিক, স্যার। জেনে রাখা উচিত।’ আমরাও সায় দিই। মোদ্দাকথা, এই বাহানায় পড়া ধরা ছাড়াই ক্লাসটা পার হয়ে গেলেই বাঁচোয়া।
শরাফতকেই হুকুম দিলেন স্যার, ‘যা তো, লাইব্রেরি থেকে ডিকশনারিটা নিয়ে আয়।’
লাইব্রেরি মানে স্কুলের পাঠাগার। আমাদের ক্লাসরুমের তিনটা রুম পরেই। শরাফত ডিকশনারি নিয়ে আসতেই স্যার প্রশ্ন করলেন, ‘ইনডোসমেন্ট বানানটা খেয়াল আছে রে?’
‘মনে আছে স্যার, আই এন ডি ও এস এম ই এন টি।’
শরাফতের কথা শুনে স্যার বোর্ডে গোটা গোটা অক্ষরে লিখলেন, Indosment. তারপর ডিকশনারিতে ডুব দিলেন।
নির্দিষ্ট পাতায় এসে দুই–তিনবার খুঁজেও শব্দটা পাওয়া গেল না। স্যার বললেন, ‘এটা তো এ টি দেবের ডিকশনারি, অনেক আগের ছাপা। তখন হয়তো এ শব্দের জন্মই হয়নি। তোরা কি জানিস, ইংরেজি শব্দভান্ডারে বছর বছর নতুন শব্দ যোগ হয়?’
‘জি স্যার, ঠিক কথা।’ আমরা কয়েকজন বলি।
আসলে আমরা কেউ এটা জানতাম না। তাতে কী, এখন তো জানলাম! আমি কেবল মনে মনে বললাম, হে ইংরেজি, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন!
স্যার শরাফতের হাতে ডিকশনারিটা ফেরত দিয়ে বললেন, ‘এটা রেখে নতুন ছাপা বাংলা একাডেমির ডিকশনারিটা নিয়ে আয়।’ দ্বিতীয় ডিকশনারিতেও Indosment নেই। আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও পাওয়া গেল না। স্যার হতাশ। এমন অবস্থায় সেকেন্ড বেঞ্চের কোনা থেকে বসির বলল, ‘স্যার, শব্দটা তো ইংরেজি। তাই বোধ হয় বাংলা একাডেমির ডিকশনারিতে নেই। আমাদের উচিত ইংরেজি একাডেমির ডিকশনারি দেখা।’
‘চুপ কর, ডেপো ছেলে কোথাকার!’ স্যারের একটা ধমকেই বসির চুপসে যায়।
ডেপো শব্দটা এর আগেও দুয়েকবার স্যারের মুখে শুনেছি। এর মানে যে কী হতে পারে, আমাদের ক্লাসের কারোর জানা নেই। অবশ্য আমার জানা উচিত ছিল। পুরো ক্লাসে একমাত্র আমিই দু–চার লাইন ভুল ছন্দের ছড়া-কবিতা লিখি। হোক ভুল, ক্লাসমেটরা তো আর বিষয়টা ধরতে পারে না। তা ছাড়া ইতিমধ্যে স্কুলের তিনটি দেয়ালপত্রিকাও আমি করে ফেলেছি। সুতরাং ডেপো শব্দের মানেটা আমার জানা থাকা উচিত। একবার ভাবলাম, স্যারকে জিজ্ঞেস করি। পরক্ষণেই বাতিল করে দিলাম চিন্তাটা। স্যার যদি এর জন্য আমাকে বাংলা অভিধান আনতে পাঠান! দরকার নেই এত দৌড়াদৌড়ির।
দুই ডিকশনারির কোনোটাতেই যখন ইনডোসমেন্ট শব্দের অর্থ পাওয়া গেল না, তখন শরাফত মিনমিন করে বলল, ‘খান স্যারকে একবার জিজ্ঞেস করে আসব, স্যার?’ খান স্যার আমাদের ইংরেজির আরেক শিক্ষক। এই দুই শিক্ষকের মধ্যে পাণ্ডিত্য নিয়ে কিঞ্চিৎ প্রতিযোগিতা আছে। তো খান স্যারের প্রসঙ্গ উঠতেই সুচিত্র স্যার করুণার দৃষ্টিতে শরাফতের দিকে তাকান। তারপর বলেন, ‘বাপু, ইংরেজি এত সোজা নয়।’
গম্ভীর মুখে মেঝের দিকে তাকিয়ে পায়চারি করতে থাকেন স্যার। হঠাৎ মুখ তুলে শরাফতকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আচ্ছা, তুই বানানে ভুল করিসনি তো?’
‘ঠিক ধরেছেন, স্যার।’ জোর গলায় সমর্থন জানায় সেন্টু। ‘স্যার, শরাফতের ক্ষেত্রে বানান আর উচ্চারণ উল্টাপাল্টা করার বহু রেকর্ড আছে। এই তো গেল সপ্তাহেই ও কানিজ ফাতেমার নাম লিখতে গিয়ে কাজিন ফাতেমা লিখেছিল।’ সেন্টুর সঙ্গে আমিও সায় দিলাম, ‘হ্যাঁ, স্যার। গত মাসেই পরীক্ষার খাতায় ও বাদশা আলমগীরের নাম লিখেছিল বাদশা আল মগীর!’
এত জোরালো প্রমাণ পেয়ে স্যারের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। মুচকি হেসে অভয় দিয়ে তিনি শরাফতকে বলেন, ‘ঠিকঠাকমতো ভেবে বল, আসলে বানানটা কী? ইনডোসমেন্ট বিষয়টা তো আমাকে শান্তি দিচ্ছে না রে।’
শরাফত নিজেও এবার ট্যাপ খেয়ে যায়। কনফিডেন্সে ফাটল ধরে গেছে ওর। চিন্তিত চেহারায় স্কুলব্যাগটা খুলে বইয়ের ভিড়ে হাতড়ায়, কী যেন খুঁজতে থাকে।
তারপর বের করে ভাঁজ করা একটা কাগজ। তারপর কাগজটা স্যারের হাতে তুলে দিতে দিতে বলে, ‘বাসায় পুরোনো কাগজ পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা সিমেন্টের বস্তার গায়ে শব্দটা লেখা দেখলাম। তাই এটা কেটে নিয়ে এসেছি।’
স্যার কাগজটা মেলে ধরে দেখলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, ‘তুই ঠিকই বানানে ভুল করেছিস। এস পেলি কোথায়? এখানে তো সি লেখা। আর পুরো শব্দটার বানান হচ্ছে Indocement.’ ব্যাপার শুনে পুরো ক্লাসে হাসির রোল পড়ল।
‘অ্যাই, চুপ।’ স্যারের এক ধমকেই ক্লাস ঠান্ডা। বানান যা–ই হোক, নতুন শব্দটার মানে জানতে হবে, বলতে থাকেন স্যার। ‘দ্বিতীয় ডিকশনারিটা তো এখনো লাইব্রেরিতে ফেরত পাঠাইনি। ওটা খুলে দেখা যাক।’
টেবিলে পড়ে থাকা বাংলা একাডেমির ডিকশনারিটা খুললেন স্যার। পৃষ্ঠা ওলটানোর মুহূর্তে একটু থমকে গেলেন। তারপর বললেন, ‘আরে, এটা তো সিমেন্টের বস্তায় লেখা ছিল। তার মানে এটা ইন্ডোসমেন্ট (Indocement) নয়, শব্দটা হচ্ছে ইন্দোসিমেন্ট (Indocement)।’ তারপর স্যার কাগজটা আমাদের দিকে মেলে ধরে বুঝিয়ে বলতে থাকেন। বেশ কয়েক বছর আগে সিমেন্ট বিক্রি হতো কাগজের বস্তায়। এটা সে রকমই একটা বস্তার অংশ। তখন সিমেন্ট তৈরির মূল উপাদানটা নাকি আসত ইন্দোনেশিয়া থেকে। তাই বস্তার গায়ে লেখা থাকত ইন্দোসিমেন্ট।
যাক, আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। বাঁচলাম মানে, ততক্ষণে ক্লাসের সময় প্রায় শেষ।
স্যার বললেন, ‘শরাফতের মুখে ইন্ডোসমেন্ট শব্দটা শুনে আমিই তো ভ্যাবাচেকা খেয়ে দুই–দুইটা ডিকশনারি আনালাম। তাহলে শব্দটা বাস্তবে না থাকলেও আমরা ব্যবহার শুরু করতে পারি। এই যেমন ধর, কোনো কিছু হঠাৎ দেখে বা শুনে কিছু সময়ের জন্য তালগোল হারিয়ে ফেললে, সেই অবস্থাকে আমরা ইংরেজিতে কী বলব?’
পুরো ক্লাস হাত তুলে সমস্বরে বলে উঠল, ‘ইন্ডোসমেন্ট’।