মন্টু ভীষণ বিপদে পড়েছে। কোনো ফকিরকেই রাজি করাতে পারছে না। মা তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন একটা ফকির ধরে নিয়ে আসতে, যে টানা সাত দিন তাদের বাসায় দুপুরের খাবার খাবে। মায়ের নাকি কী একটা মানত আছে। কিন্তু টানা সাত দিন খাওয়ার মতো কোনো ফকির পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো ফকিরই রাজি হচ্ছে না। কী জ্বালা! এ নিয়ে কাহিনিও কম হয়নি।
প্রথম যে ফকিরটাকে সে বলেছিল সেই ফকির সাত দিন খেতে হবে শুনে বলল:
আইজকা কী খাওয়াইবা? মাছ না মুরগি? দেইখ গরু কিন্তু খাই না।
হায় হায়, কী খাওয়াবে তা তো মন্টু জানে না। আবার ছুটল বাসায়।
মা?
কী হলো ফকির এনেছিস?
না। ফকির জানতে চাচ্ছে আজ মেন্যু কী?
উফ্ এ দেখি লাটসাহেব ফকির, গিয়ে বল খিচুড়ি আর মুরগি।
মন্টু ছুটে এসে জানাল, খিচুড়ি আর মুরগি। ফকির গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। তারপর বলল:
মুরগি কি ফার্মের?
মন্টুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আবার ছুটল বাসায়।
মা?
কী হলো ফকির এনেছিস?
না। ফকির জানতে চাচ্ছে ফার্মের মুরগি, না দেশি মুরগি?
উফ্ এ দেখি লাটসাহেব, নবাবের বাচ্চা...। গিয়ে বল ফার্মের মুরগি, দেশি মুরগির গায়ে হাত দেওয়া যায়?
মন্টু আবার ছুটল।
ফার্মের মুরগি।
না, ফার্মের মুরগি চলে না আমার। অসুবিধা আছে। গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ে বুড়ো ফকিরটা। রাগে গা জ্বলে যায় মন্টুর। এভাবে তিন-চারটা ফকিরের সঙ্গে কথা বলার পর একজন রাজি হলো।
তাহলে চলেন আমাদের বাসায়।
বাসা কদ্দুর? হাডায়া নিবা, না রিকশায়?
বাসা কাছেই হেঁটে যাওয়া যাবে।
কয়ডা বাজে?
দুটা।
তাইলে এক কাম করো। এহন যাওয়া যাইব না। আরেক জায়গায় বিরানির দাওয়াত আছে। আমি প্যাকেটটা লয়া আহি, তুমি খানাটা ফিরিজে রাইখা দেও! আবার দেইখো ডিপ ফিরিজে রাইখ না। শুনে মন্টুর দুই কান দিয়ে ধোঁয়া বের হয়। ঠিক তখন বিটুল ভাই তাকে উদ্ধার করলেন যেন। বিটুল তাদের পাড়ার এক বড় ভাই। তাদের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। সবার বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া পাবলিক। একটা নাট্যদলের কর্মী। থাকেন একটা মেসে। বোহেমিয়ান টাইপ পাবলিক।
কিরে মন্টু কেস কী? তখন থেকে দেখছি ফকিরের পিছে পিছে ঘুরঘুর করছিস?
মন্টু হতাশ হয়ে সব খুলে বলল। বিটুল ভাই সব শুনে মাথা নাড়ল। নো চিন্তা ডু ফুর্তি। তুই বাসায় যা, আমি ফকির নিয়ে আসছি। খাবার-দাবার রেডি কর। মন্টুর যেন জানে পানি আসে।
বিটুল ভাই সত্যি ফকির নিয়ে আসবে তো?
অবশ্যই।
মন্টু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে ছুটল বাসায়।
কিরে ফকির এনেছিস? মা জিজ্ঞেস করেন।
হ্যাঁ, ফকির আসছে। তুমি খাবার দাও।
যা এগুলো বারান্দায় নিয়ে যা, পাটি পেতে সুন্দর করে খেতে দে। টানা সাত দিন খাবে তো?
হ্যাঁ, খাবে। যদিও মন্টু জানে না, সাত দিনই বিটুল ভাই ফকির ম্যানেজ করে দেবে কি না।
মন্টু হুকুম পালন করল। বাইরে পাটি বিছিয়ে টিনের থালে খিচুড়ি আর বাটিতে মুরগি। বরফ ধোয়া ঠান্ডা পানি। আলাদা প্লেটে একটু সালাদ। লবণ। সব রেডি। এখন বিটুল ভাই ফকির নিয়ে এলেই হয়। না এলে সাড়ে সর্বনাশ! কিন্তু একি?! ফকিরই এসেছে। ছেঁড়া লুঙ্গি-গেঞ্জি, কাঁধে পোঁটলা। মাথায় টুপি, হাতে একটা লাঠিও আছে। ফকির মন্টুর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। এ যে বিটুল ভাই।
মানে? বিটুল ভাই তুমি?
শশশশ... চুপ, কথা বলিস না। ফিসফিস করে বলে বিটুল ভাই খেতে বসে যায়। পাশে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মন্টু। এর মানে কী? বিটুল ভাইয়ের অনেক পাগলামি আছে, তাই বলে তাদের বাসায় বারান্দায় বসে ফকির সেজে খাওয়া!!
এক ফাঁকে মা এসে উঁকি মেরে দেখে যায় ফকির ঠিকঠাকমতো খাচ্ছে কি না। ভয়ে কলজে উড়ে যায় মন্টুর, এখন যদি মা টের পেয়ে যায় বিটুল ভাই খাচ্ছে। অবশ্য মা বিটুল ভাইকে নাও চিনতে পারে।
কিরে মন্টু ঘাবড়াচ্ছিস কেন? খেতে খেতে বিটুল ভাই ফিসফিস করে বলে। শোন, আমি আসলে ফকিরই, বুঝলি। চাকরি নাই তিন মাস, মেসের ভাড়া বাকি পড়েছে ছয় মাস। কই খাই, কী খাই কোনো ঠিক নাই। ভাগ্যিস, তোর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সাত দিনের দুপুরের খাওয়া নিশ্চিত। আচ্ছা মন্টু, কাল কী মেন্যু হবে বলতে পারিস?
মন্টু মাথা নাড়ে।
ভালোই চলছিল। তবে এত বড় ঘটনা পেটে চেপে রাখা মুশকিল মন্টুর পক্ষে। মন্টুর পাড়ার ফ্রেন্ডরা সবাই জেনে গেল। তাদের প্রিয় বিটুল ভাই মন্টুদের বাসায় প্রতিদিন দুপুরে ফকির সেজে ভাত খায়! এ তো বিরাট কাহিনি। একদিন সবাই দল বেঁধে দেখতেও এল। বিটুল ভাই মুখে আঙুল দিয়ে শুধু বললেন
—শশশশশ...
মন্টুর মা ফকিরকে ডাল দিতে এসে অবাক।
একি, তোমরা এখানে?
আন্টি ফকির খাওয়া দেখি।
উফ্ ফকির খাওয়া দেখার কী আছে, ভেতরে এসো সবাই। তবে তারা ভেতরে যায় না, মিটিমিটি হেসে বিটুল ভাইয়ের খাওয়া দেখে।
ভালোই চলছিল, কিন্তু ষষ্ঠ দিনে ধরা পড়ে গেলেন বিটুল ভাই। দোষটা বিটুল ভাইয়েরই। মন্টুর বড় আপা মিলি ভার্সিটি থেকে ফিরে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল। বিটুল ভাই তখন আয়েশ করে খাওয়া-দাওয়া শেষে বেনসন সিগারেটে লম্বা একটা টান দিল। সেও খেয়াল করেনি মন্টুর বোন মিলিকে।
আপনি বিটুল ভাই না?
থতমত খেয়ে সিগারেট ফেলে বিটুল ভাই কোনোমতে বলে, ‘জে আপা আমারে কিছু কন?’
ফাজলামো করেন? কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ায় মিলি আপা। মন্টু আশপাশেই ছিল, তার কলজে উড়ে যায়, এখন কী হবে?