দ্য ম্যান হু সেভড দ্য ওয়ার্ল্ড…

১৯৪৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত চলা শীতল স্নায়ুযুদ্ধে আমেরিকা অফিশিয়াল হিসাবেই ১ হাজার ৫৪টি নিউক্লিয়ার বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল!

সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার মধ্যে তখন শীতল স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। দুই দেশই পাগলের মতো নিউক্লিয়ার বোমা বানানোয় ব্যস্ত। যদিও ঠিক কোনো পক্ষই চাইছিল না যে একটা সত্যিকারের যুদ্ধ বেধে যাক, তা-ও যদি লেগে যায়, তাই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা আরকি। টান টান এই উত্তেজনার সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের এয়ারবেইজের ওপর দিয়ে একটা স্পাই বিমান উড়ে গেছে সন্দেহ করে কোরিয়ান এয়ার কমার্শিয়াল ফ্লাইট গুলি করে উড়িয়ে দিল। বিমানে থাকা ২৬৯ জন যাত্রী সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল এবং যাত্রীদের মধ্যে একজন ছিলেন জর্জিয়ার কংগ্রেসম্যান। এই ঘটনার পর আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়নকে সরাসরি ‘শয়তানের আস্তানা’ নাম দিয়ে দিল।

শীতল এই স্নায়ুযুদ্ধ বেশ জটিল একটা অবস্থায় ছিল। কোন পক্ষ সঠিক, তা বলা ছিল ভয়াবহ মুশকিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সংসদ নেতা ইউরি ভি আন্দ্রোপভ এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান দুজনেই ছিলেন একই রকম উন্মাদ। সমস্যা হচ্ছে উন্মাদনার মতো একটা বিষয় ভাইরাসের মতো। খুব দ্রুত ছড়ায়। এই দুই দেশের প্রধানের উন্মাদনা ছড়িয়ে গিয়েছিল সেনাবাহিনীর প্রধানদের মধ্যেও। দুই পক্ষের সেনাপ্রধানেরা আকাশ, জল বা স্থলের কোথাও অস্বাভাবিক কিছু হচ্ছে কি না, আক্রমণের কোনো লক্ষণ বোঝা যাচ্ছে কি না—তা দেখার জন্য দেশজুড়ে অসংখ্য ওয়াচ স্টেশন বানিয়ে অফিসার বসিয়ে দিয়েছিলেন। এদিক দিয়ে অবশ্য এগিয়ে ছিল বেশি সোভিয়েত ইউনিয়ন।

হঠাৎ একদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের এক ওয়াচ স্টেশনেই প্রথম অস্বাভাবিক একটা ঘটনা ধরা পড়ল। স্টেশনে ছিলেন স্তানিস্লাভ পেত্রভ।

পেত্রভ ছিলেন সোভিয়েত এয়ার ডিফেন্স ফোর্সের একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল। তিনি তখন কাজ করছিলেন আমেরিকানদের কোনো নিউক্লিয়ার আক্রমণ বা মিসাইল লঞ্চিংয়ের সোভিয়েত আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমে। সিস্টেমের কোড নেম ছিল ‘ওকো’, এর অর্থ সোজা বাংলায় হচ্ছে চোখ। পেত্রভ তখন সারপুখভ-১৫ নামের এক গোপন কমান্ড সেন্টারে বসা। এই কমান্ড সেন্টারগুলো ছিল শহরের নিচে বিশাল, আক্ষরিক অর্থেই বিশাল বাংকার। সারপুখভ-১৫ নামের এই কমান্ড সেন্টার বানাতে পেত্রভ নিজেও কাজ করেছিলেন।

১৯৮৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। পেত্রভ নিজেই ছিলেন স্টেশন কন্ট্রোল রুম ডিউটিতে। হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে উঠল। বাংকারের ভেতরের সব কম্পিউটার সিগন্যাল দিচ্ছে আমেরিকান বেইজ থেকে পাঁচটা মিনিটম্যান ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল ছোড়া হয়েছে, সেকেন্ড কয়েক পর চারটা মিসাইল চিহ্নিত করা হয়ে গেল।

পেত্রভের ডিউটি ছিল এই ঘটনা তাঁর সুপিরিয়র বসকে জানানো, তিনি এই মেসেজ পাঠাবেন মিলিটারির জেনারেল স্টাফকে এবং তাঁরা ইউরি আন্দ্রোপভের সঙ্গে বসে কাউন্টার অ্যাটাকের সিদ্ধান্ত নেবেন। মিসাইল লঞ্চ থেকে ডিটোনেশন পর্যন্ত যেতে সময় লাগবে মাত্র ২৫ মিনিট! পেত্রভ মোটামুটি জায়গাতেই জমে গেলেন। ২০১৩ সালে বিবিসির কাছে এক ইন্টারভিউতে পেত্রভ বলেছিলেন, ‘স্ট্রাইক হয়েছে—তা কতক্ষণের মধ্যে সুপিরিয়র বসকে জানাতে হবে, এ রকম কোনো সময় তখন আসলে নির্ধারিত ছিল না। কিন্তু জানতাম, তখনকার প্রতিটি সেকেন্ড অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পলিটিক্যাল লিডারশিপ এবং মিলিটারির খবরটা কোনো রকম কোনো দেরি না করেই জানানো উচিত। ওই সময় আমার করণীয় শুধু এটুকুই ছিল, পাশে থাকা ফোনটা তুলে আমাদের টপ কমান্ডারদের জানানো। সমস্যা হচ্ছে আমি নড়তেই পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল একটা গরম কড়াইয়ের ওপর বসে আছি।’

স্তানিস্লাভ পেত্রভ

তো যা–ই হোক, পেত্রভ সিদ্ধান্ত নিলেন অ্যালার্টটাকে কম্পিউটার ম্যালফাংশন হিসেবে রিপোর্ট করবেন। ১৯৯৯ সালে ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেত্রভ বলেছিলেন, ‘আমার পেটের ভেতর বিচিত্র একটা অনুভূতি হচ্ছিল। আমি ওই সময় কোনো ভুল করতে চাইনি। তাই আমার নেওয়া সিদ্ধান্ততেই অবিচল ছিলাম।’

আজকের এই পৃথিবী কেমন হতো, তা আমরা জানতেই পারতাম না, যদি পেত্রভ ওই সময় নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ওপর ভরসা না করতেন। পেত্রভের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ঠিকই বলেছিল। পরে তা প্রমাণিত হয়েছে।

সিগন্যালগুলো ছিল আসলে হাই-অলটিটিউড স্তরে থাকা মেঘে সূর্যরশ্মির প্রতিফলন, এই প্রতিফলনগুলোকেই স্যাটেলাইট ভুলে মিসাইল লঞ্চ হিসেবে ধরে নিয়েছিল।

এভাবেই পেত্রভ একটা পারমাণবিক যুদ্ধের হাত থেকে নিজের দেশ ও আমেরিকা, হিসাব করলে আসলে পৃথিবীকেই বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।

পেত্রভের এই অ্যালার্ম ম্যালফাংশনের কথা প্রথম পৌঁছে ইউরি ভোটিন্টসেভের কাছে, এরপর সোভিয়েত এয়ার ডিফেন্সের মিসাইল ডিফেন্স ইউনিট কমান্ডারের কাছে। পেত্রভের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইউরি ভোটিন্টসেভ খুব প্রশংসা করলেও পেত্রভকে সামরিক বাহিনীতে বেশ ভালোই লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল ওয়ার ডায়েরির কাগজপত্র ঠিকঠাকমতো পূরণ না করার জন্য।

এই ঘটনার এক বছর পর, ১৯৮৪ সালে পেত্রভ মিলিটারি থেকে অবসর নিয়ে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে রিসার্চ ইউনিটে যোগদান করেন। এই রিসার্চ ইউনিটের কাজটাই হচ্ছে ওয়ার্নিং সিস্টেমটাকে ক্রমাগত উন্নত করা।

১৯৮৩ সালের এই ঘটনা এবং তাতে স্তানিস্লাভ পেত্রভের ভূমিকা প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৯৮ সালে। কর্নেল জেনারেল ইউরি ভোটিন্টসেভ তাঁর অবসরের সময় পুরোনো দিনের কথা বলতে গিয়ে প্রথম এই ঘটনা উল্লেখ করেন। হঠাৎ করেই পৃথিবী জেনে গেল, ‘স্তানিস্লাভ পেত্রভ নামের একটা মানুষের জন্য পৃথিবী সম্ভাব্য একটা পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে বেঁচে গেছে।’

২০০৬ সালে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ওয়ার্ল্ড সিটিজেনস’ থেকে পেত্রভকে সম্মাননাসূচক পুরস্কৃত করা হয়। ২০১৩ সালে পেত্রভকে ‘ড্রেসডেন পিস প্রাইজ’ দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। পেত্রভকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি ড্রামাও তৈরি হয়েছে, নাম দ্য ম্যান হু সেইভড দ্য ওয়ার্ল্ড। ডিরেক্টর ছিলেন পিটার অ্যান্থনি।

২০১৭ সালের মে মাসে ৭৭ বছর বয়সে পেত্রভ মৃত্যুবরণ করেন, যদিও খবরটি ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এত পুরস্কার, প্রশংসার পরও পেত্রভ ১৯৮৩ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনাটিকে ‘স্রেফ নিজের ডিউটি করেছি’ ছাড়া কখনোই অহংকার করে কোনো কিছু কোথাও বলেননি।

এই মানুষগুলোর জন্যই এখনো আমরা বেঁচেবর্তে আছি…

তথ্যসূত্র: দ্য ভিন্টেজ নিউজ

আরও পড়ুন