অবশেষে পৃথিবীতে ফিরলেন ব্যারি উইলমোর ও সুনিতা উইলিয়ামস
নয় মাস মহাকাশে কাটানোর পর অবশেষে পৃথিবীতে ফিরেছেন নাসার দুই নভোচারী ব্যারি উইলমোর ও সুনিতা উইলিয়ামস। তাঁদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে ফেরেন আরও দুই নভোচারী। ১৮ মার্চ, মঙ্গলবার তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবতরণ করেন।
তাঁদের স্পেসএক্স ক্যাপসুলটি দ্রুত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এরপর চারটি বড় প্যারাশুট খুলে ক্যাপসুলটিকে ধীরে ধীরে আটলান্টিক মহাসাগরে নামিয়ে আনে। যখন তারা পানিতে নামলেন, তখন কিছু ডলফিন ক্যাপসুলের চারপাশে ঘুরছিল!
কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্ধারকারী জাহাজ এসে ক্যাপসুলটি পানির ওপরে তোলে। এরপর ব্যারি, সুনিতা এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা নাসার নভোচারী নিক হেগ ও রুশ নভোচারী আলেক্সান্দার গর্বুনভও ক্যাপসুল থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁরা হাত নাড়িয়ে হাসিমুখে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। নাসার কর্মকর্তারা জানান, ‘তাঁরা সুস্থ আছেন এবং খুব খুশি’।
আট দিনের পরিকল্পনা, নয় মাসের যাত্রা!
এই মিশনটি মাত্র আট দিনের জন্য পরিকল্পিত ছিল। কিন্তু তা টানা নয় মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে ব্যারি ও সুনিতা বোয়িং কোম্পানির তৈরি স্টারলাইনার মহাকাশযানে করে মহাকাশ স্টেশনে যান। এটি ছিল স্টারলাইনারের প্রথমবারের মতো মানুষ নিয়ে মহাকাশে যাওয়ার পরীক্ষা। কিন্তু মহাকাশযানটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নাসা স্টারলাইনারকে খালি অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে। আর ব্যারি ও সুনিতাকে পাঠানো হয় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। কিন্তু সেখান থেকে পৃথিবীতে ফেরার জন্য কোনো নভোযান ছিল না। ফলে তাঁদের সেখানে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়। পরে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে স্পেসএক্সের আরেকটি ক্যাপসুল মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছায়। যেখানে চারজনের জায়গায় পৃথিবী থেকে পাঠানো হয় মাত্র দুজন। যাতে ভবিষ্যতে ব্যারি ও সুনিতা পৃথিবীতে ফিরতে পারেন। কিন্তু সব মিলিয়ে এই পরিকল্পনাটা ছিল ছয় মাসের।
কিন্তু ছয় মাস থেকে তা নয় মাসে পরিণত হয়। এ সময় তাঁরা নানা ধরনের গবেষণা ও পরীক্ষা চালিয়েছেন। সুনিতা উইলিয়ামস সবচেয়ে বেশি সময় মহাকাশের বাইরে (স্পেসওয়াক) কাটানোর নতুন রেকর্ড করেছেন।
মহাকাশে থাকার সময় শরীর অনেক আরামে থাকে, যেন একটা বিশ্রামের মতো। কিন্তু পৃথিবীতে ফিরে এলে আবার মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়।ব্রিটিশ নভোচারী টিম পিক
শুধু কাজই নয়, উৎসবও করেছেন তাঁরা! বড়দিনে তাঁরা সান্তা ক্লজের টুপি ও হরিণের শিংয়ের মতো হেডব্যান্ড পরে আনন্দ করেছেন, আর পৃথিবীর মানুষকে শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন। যদিও তাঁরা এই উৎসব পরিবারের সঙ্গে কাটানোর কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু মহাকাশেই তাঁদের বিশেষ দিনগুলো কেটেছে।
পৃথিবীতে ফেরার পরপরই পরীক্ষা-নিরীক্ষা
দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার ফলে শরীরে অনেক পরিবর্তন আসে। তাই পৃথিবীতে ফিরে আসার পর তাঁদের শরীরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। মহাকাশে দীর্ঘদিন থাকলে মানুষের হাড় ও পেশি দুর্বল হয়ে যায়, রক্ত সঞ্চালনে পরিবর্তন আসে, এমনকি দৃষ্টিশক্তিতেও প্রভাব পড়তে পারে।
ব্রিটিশ নভোচারী টিম পিক বলেন, ‘মহাকাশে থাকার সময় শরীর অনেক আরামে থাকে, যেন একটা বিশ্রামের মতো। কিন্তু পৃথিবীতে ফিরে এলে আবার মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়।’
এজন্য ব্যারি ও সুনিতাকে একটি বিশেষ ব্যায়ামের মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হবে।
সুনিতা উইলিয়ামস কয়েক সপ্তাহ আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি আমার পরিবারকে দেখতে চাই, আমার কুকুরদের সঙ্গে সময় কাটাতে চাই, আর চাই সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে! পৃথিবীতে ফিরে এসে মাটির স্পর্শ পাওয়াটা দারুণ হবে।’
এই দীর্ঘ ও অপ্রত্যাশিত মহাকাশযাত্রার পর ব্যারি ও সুনিতা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। তবে তাঁদের এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: বিবিসি