বনবিড়ালের কান্না
ভয়ংকর গরম পড়ছিল সেদিন। আমার চাচাতো ভাইয়ের কাঁচা ঘরের উঠানে শুয়ে আছি। সুনসান অন্ধকার রাত। সারা দিনের কর্মব্যস্ত মানুষগুলো ততক্ষণে গভীর ঘুমে অচেতন। চাপ চাপ অন্ধকারে ঢেকে আছে চারপাশ। জোনাকিরা এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে মিটিমিটি আলো জ্বালিয়ে। মাঝেমধ্যে হুমহাম করে ডেকে উঠছে একটা হুতুম প্যাঁচা। কিড়িকিড়ি স্বরে একটানা ডেকে চলেছে ঝিঁঝিপোকার দল। কিন্তু এসব শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙার জন্য যথেষ্ট নয়।
আমি রাতজাগা মানুষ, তাই অত সহজে ঘুম আসে না। শৈশবের সুখস্মৃতি রোমন্থন করে অতীতে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু সেই রাতে হঠাৎ অন্ধকারের বুক চিরে, নিস্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে একটা ভয়ংকর ডাক ভেসে আসে সামনের জংলি বাগান থেকে; ভয়ানক এক গর্জন। মাউফ, মাউফ...একবার, দুবার…একটানা অজস্রবার। ভয়ে কলজে কেঁপে উঠল সেই ছোটবেলার মতো।
এই ভয়ের কোনো মানে নেই। বনবিড়াল মানুষ খায় না, এমনকি মানুষকে কখনো আক্রমণও করে না; বরং মানুষ দেখলে বিদ্যুৎগতিতে পালায়। অতটুকু একটা প্রাণী; মানুষকে কাবু করা ওর পক্ষে সম্ভব নয়।
তবু কেন ভয়? ভয়টা বোধ হয় ডিএনএর ভেতরই গাঁথা। যুগ যুগ ধরেই মানুষ বিড়াল প্রজাতিকে ভয় পেয়ে আসছে। বিশেষ করে বাঘ, সিংহ, জাগুয়ার, চিতা বাঘের মতো বিগ ক্যাটদের।
বিগ ক্যাটদের ভয় পেলে কি স্মল ক্যাটদেরও ভয় পেতে হবে? কী জানি, প্রাণী–গবেষকেরা ভালো বলতে পারবেন।
বনবিড়াল অবশ্য তখনো সেভাবে দেখিনি। এরা নিশাচর প্রাণী, দিনের বেলা গ্রামের বনে দেখা পাওয়া ভার। তবু তারা কিছু চিহ্ন রেখে যায়, খোঁয়াড় থেকে হাঁস-মুরগি চুরি করে নিপুণ দক্ষতায়। ছোটবেলায় হাঁস-মুরগি চুরির এদের দক্ষতাই মনে ভয় ধরিয়ে দিত। তার ওপর গভীর অন্ধকার রাতে উচ্চস্বরে এই ভয়ংকর ডাক!
তারপরও ভয় ছাপিয়ে মনে রোমাঞ্চ ভর করত মাঝেমধ্যে। ইশ্! একবার যদি এদের দেখা পেতাম! শিয়ালকেও ভয় পেতাম। তারপরও মাঝেমধ্যে শিয়ালের দেখা পেয়ে যেতাম গ্রামের বনবাঁদাড়ে। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত ভয়ে আর রোমাঞ্চে। কিন্তু বনবিড়াল এই রোমাঞ্চের স্বাদ কোনো দিনই পেতে দেয়নি আমাকে।
২
১৮ জানুয়ারি ২০১৮ সাল। ছোট ভাইদের সঙ্গে নিয়ে ক্যামেরা হাতে বেরিয়েছি ইছামতীর উদ্দেশে। নদীতে শামুকখোল পাখিদের একটা আস্তানা আছে। সুতরাং এ সুযোগ মিস করি কী করে!
ইছামতী আমাদের গ্রামটাকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে আলাদা করেছে। অর্থাৎ ইছামতীর অবস্থান এখানে নো ম্যানস ল্যান্ডে। নদী পার হওয়ার অনুমতি নেই। তবে নো ম্যানস ল্যান্ড হলেও নদীর কিনারা অথবা পানিতে নামতে নিষেধ নেই। সুতরাং সেখানে গিয়ে ছবি তুলতেও নেই কোনো বাধা।
শামুকখোল পেলাম ঠিকই। ছবিও তুললাম। শীতকালের শেষ বিকেলে ঝপ করে সন্ধ্যা নামে। দেখতে দেখতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সূর্য বড় থালাটির মতো লাল হয়ে দিগন্তের ওপারে মুখ লুকিয়ে ফেলে। পাখিরা সব ঘরে ফিরে গেছে। তবে সব পাখি নয়, কিছু পোষা হাঁস আর ডাহুক তখনো নদীর কিনারায় খাবার খুঁজে চলেছে।
হঠাৎ চোখে পড়ল, হাঁসগুলো যেখানে চরে বেড়াচ্ছে, ঠিক তার ওপরই একটা ঝোপের ভেতর লুকোচুরি খেলছে একটা শিয়াল। লালচে বাদামি মাথাটা বারবার উঁকি দিচ্ছে বুনো গুল্ম–লতার ফাঁকফোকর দিয়ে। আসলে শিয়াল বাবাজি হাঁস চুরির মতলবে এসেছে। নদীর ওপারে তার অবস্থান। তাই আমাদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না। আবার হাঁসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, সে সাহসও পাচ্ছে না বেচারা।
আমি ক্যামেরা হাতে আরেকটু এগিয়ে গেলাম। ট্রাইপডে ক্যামেরা সেট করে শিয়ালের ছবি নিলাম কয়েকটা। কিন্তু ভরসন্ধ্যায় আলো কমে গেছে। সুতরাং স্পষ্ট ছবি পাওয়া মুশকিল। তবু তুললাম। যদি ফটোশপে গিয়ে একটু আলো বাড়িয়ে নেওয়া যায়। ঠিক তখনই দেখলাম, ওপারে কলাবাগানের ভেতর আরেক অতিথি এসে হাজির! সে আমাদের দেশি জাঙ্গল ক্যাট বা বনবিড়াল (Felis chaus)। ছোটবেলায় না পাওয়া রোমাঞ্চের স্বাদ সেদিন মিটে গেল।
বনবিড়ালটা অনেকক্ষণ ধরে হাঁসের আশপাশে ঘুরঘুর করল। এপারে আমাদের দেখল। তবে ছুটে পালাল না। সম্ভবত ও বোঝে যে নদী পার হয়ে ওকে তাড়া করতে যাব না।
এই সুযোগ ছাড়ি কেন! ট্রাইপডে ক্যামেরা লাগানোই ছিল। পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। কিন্তু ৩০০ মিলিমিটারের জুম লেন্সে সুবিধা হলো না। তবে গলায় ঝুলছে ৪২এক্স জুমের একটা পয়েন্ট অ্যান্ড শুট ক্যামেরা। ওটা দিয়ে বেশ কিছু ক্লোজ ছবি নিতে পারলাম। তবে ওই যে আলো কম! প্রচুর নয়েজ এল। তবু তো ছবি তুলতে পেরেছি, কজনের ভাগ্যে বনবিড়ালের ছবি জোটে!
অবশ্য বনবিড়াল এর আগেও কয়েকবার দেখেছি, কিন্তু সে ক্ষণিকের দেখা। বিদ্যুৎগতিতে প্রতিবারই ঝোপজঙ্গলের ভেতর হারিয়ে গেছে। ছবি তোলা তো দূর অস্ত।
আগে দেখলেও সেগুলোর সব ছবিই ছিল সাদা–কালো। এই প্রথম লালচে বাদামি বনবিড়াল দেখলাম। রং আলাদা হলেও জাঙ্গল ক্যাটগুলো একই প্রজাতির।
বাংলাদেশে বেশ কয়েক রঙের জাঙ্গল ক্যাট দেখা যায়। কিছু বনবিড়ালের গায়ের রং সাদা। পায়ে ও লেজে ডোরাকাটা দাগ থাকে। কিছু ধূসর, তার ওপর কালো ডোরাকাটা। তবে সবচেয়ে সুন্দর লালচে বাদামি রঙের ওপর ডোরাকাটা দাগের এই বনবিড়াল। দেখতে অনেকটা বাঘের মতো লাগে।
৩
জাঙ্গল ক্যাট বা বনবিড়ালের দেহের আকার ৬০ থেকে ৭৬ সেন্টিমিটার। সাধারণ বিড়ালের তুলনায় আকারে প্রায় তিন গুণ। পাতিশিয়ালের আকারের প্রায় সমান। তবে শিয়ালের চেয়ে পা খাটো। অবশ্য অন্যান্য বিড়ালের চেয়ে এদের পা বেশ লম্বা। তাই এরা অনেক বড় বড় লাফ দিতে পারে। খুব সহজেই গাছে চড়তে পারে, পাঁচিল টপকে গৃহস্থের বাড়িতে হানা দেয় হাঁস-মুরগি আর কবুতরের লোভে।
তাই মানুষও এদের ওপর মহাখাপ্পা। দেখতে পেলেই পিটিয়ে মেরে ফেলে। তবে মানুষ যতটা ক্ষতিকর মনে করে গ্রামীণ বনের এই প্রাণীকে, এরা মোটেও অতটা ক্ষতিকর নয়। বরং ইঁদুর খেয়ে ফসলের উপকারই করে। তা ছাড়া হাঁস-মুরগিও এদের প্রধান খাদ্য নয়।
বনবিড়াল নিশাচর প্রাণী। রাতের আঁধারে গাছে উঠে পাখির বাসা থেকে পাখি বা তাদের ছানা ধরে খায়। ইঁদুর, খরগোশ, মেঠো পাখি, টিকটিকি, গিরিগিটিও আছে এদের প্রধান খাদ্যতালিকায়। নিতান্তই খাবারের অভাব হলে এরা গৃহস্থবাড়িতে হানা দেয়।
বনবিড়াল বাংলাদেশের অন্যতম বিপন্ন প্রাণী। বাংলাদেশ ছাড়া এদের দেখা মেলে চীন, ভারত, ইসরায়েল, মিয়ানমার, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, ভুটান, জর্জিয়া, লাওস, লেবানন, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, মিসর, ইরাক, ইরান ইত্যাদি দেশে।
এসব দেশের কোনোটাতেই খুব ভালো নেই বনবিড়াল। দিন দিন এদের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। পতিত জমি কেটে সাফ করে মানুষ ফসলের খেত ও বসতভিটা তৈরি করছে। তাই গ্রামীণ জাঙ্গল ক্যাট এখন বিলুপ্তির পথে। এরা যেমন নিজেদের বসতভিটা হারাচ্ছে, তেমনি এরা যেসব প্রাণী খেয়ে বাঁচে, তাদেরও থাকার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। ফলে বনবিড়ালের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
চোরা শিকারিরা বনবিড়াল পাচার করে পয়সার লোভে। এটাও বনবিড়াল কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
৪
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। বেশ কিছুদিন পর গ্রামে গিয়েছি। তবে এক রাতের বেশি থাকা হবে না। আমার হাতে এখন আরও উন্নত মানের ক্যামেরা আর আরও বড় লেন্স। ১৫০ থেকে ৬০০ মিলিমিটারের জুম লেন্স। তাই পাখি কিংবা বন্য প্রাণীদের ছবি তোলা এখন অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম, গ্রামে গিয়ে পাখির ছবি তুলব। কিন্তু ওই দিন আকাশের মুখ গোমড়া। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই দমকা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ঝড়-বৃষ্টির আভাস। জানি, এখন ক্যামেরা নিয়ে মাঠে বেরোলে লাভ হবে না। প্রকৃতির মন পাখিরা ভালোই পড়তে পারে। দুর্যোগের আশঙ্কা দেখলেই নিরাপদ জায়গায় গিয়ে লুকায়। তা ছাড়া এত কম আলোয় পাখির ছবি তোলা অসম্ভব। ছবি উঠলেও পাখির রং ঠিকঠাকমতো আসবে না। মাঠে বেরোব কি বেরোব না, তখনই মনে পড়ে গেল নতুন একটা সম্ভাবনার কথা।
বিকেলেই যখন সন্ধ্যার ছায়া নেমেছে, তখন নির্ঘাত শিয়াল কিংবা বনবিড়ালরা আগেভাগেই আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু এলেই–বা কী? বিশাল তেপান্তরের কোন এলাকায় এরা বেরোবে, সেটা নিশ্চিত করে বলার জো নেই। একমাত্র ভাগ্যই এদের মিলিয়ে দিতে পারে।
তখন মনে মনে হিসাব কষলাম, ইছামতীর তীরে গেলে পাওয়া যাবেই; হয় শিয়াল নয়তো বনবিড়াল। কিন্তু গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সীমান্তের এত কাছে যাওয়া নিরাপদ মনে হলো না। তবু নিজেদের ভূখণ্ডে থেকে যতটা কাছাকাছি যাওয়া যায়। তাই ঠিক করলাম, পশ্চিম মাঠে ঢুকব।
ওদিকে রাতচরা পাখিদের আবাস। কে জানে, ভাগ্য ভালো হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ছদ্মবেশী পাখিটার দেখা মিলেও যেতে পারে!
একটা বাঁশবাগানে ইতিউতি করে রাতচরা খুঁজছি। ভরদুপুরের প্রখর রোদেও এদের খোঁজ পাওয়া মুশকিল। সামনে থাকলেও নয়, যদি না একটু নড়াচড়া করে। এই সন্ধ্যার ছায়ায় খুঁজে লাভ হলো না। হতাশ হয়ে আরও সামনে এগোচ্ছি, তখনই রাস্তার ওপারের একটা ধানখেতে কিসের একটা আভা দেখলাম। লালচে। বোরো ধানের উচ্চতা এখন হাঁটুসমান, তাই খুব সহজেই প্রাণীটাকে দেখে ফেললাম। প্রথম দেখায় ভেবেছিলাম, শিয়াল। পরে ভালো করে দেখে নিশ্চিত হলাম, এটা সেই কাঙ্ক্ষিত বনবিড়াল!
একদম নির্জন মাঠ। আমাকে দেখতে পায়নি ও। তাই গদাই লস্করি চালে হেলেদুলে হেঁটে চলেছে সামনের দিকে। ওদিকে একটা ভুট্টার খেত। সেটাই ওর গন্তব্য। দূরত্ব আন্দাজ করে বুঝলাম, চোখের আড়াল হতে হতে ভালো সুযোগ থাকবে ছবি তোলার।
সুতরাং তাড়াহুড়া না করে, আস্তেধীরে ক্যামেরা জুম করে ফোকাস ঠিক করে পরপর কয়েকটা শট নিলাম। পেয়ে গেলাম বেশ কয়েকটা মূল্যবান ছবি। যদিও অন্ধকারে ঢাকা ছবি। তবু হিসাব মিলে গেল। কম্পিউটারে নিয়ে একটু এক্সপোজার বাড়িয়ে নিলেই বেশ ভালো ছবি পাব। যদিও নয়েজ আসার সম্ভাবনা খুব বেশি। তবু ছবির মান আমাকে সন্তুষ্ট করল। কারণ, তোমার হাতে ৬০০ মিলিমিটার লং জুমের লেন্স থাকলেও বনবিড়ালের দেখা সারা জীবনে না–ও পেতে পারো। সৌভাগ্যের ছোঁয়া লাগবেই।
কিন্তু ছবি তোলার পর আমার একটু ভুল হলো। গুগলে ছবি চেক করে মনে হলো, এটা বোধ হয় সোনালি বিড়াল। অতি বিপন্ন ওই বিড়ালের সঙ্গে বেশ মিল আছে চেহারায়। আমার খুশি আর ধরে না! নিশ্চিত হওয়ার জন্য বন্য প্রাণী–গবেষক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই চিড়িয়াখানার কিউরেটর ড. রেজা খানকে ছবিটা পাঠালাম। তিনি নিশ্চিত করলেন যে এটা সোনালি বিড়াল নয়। জাঙ্গল ক্যাট, অর্থাৎ আমাদের বনবিড়াল।
তবু আমি খুশি। স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়লাম। ফেলে আসা সেই দিনের বনবিড়ালের গর্জনের কথা মনে পড়ল। ওদের ‘মাউফ মাউফ’ গর্জন আমাদের মনে ভয় ধরিয়ে দিত। কিন্তু ওটা ঠিক ভয় ধরানোর গর্জন নয় জানি, ওটা ওদের প্রজননকালীন ডাক। তবু মনে হলো, এই ডাক ওদের নেহাত গর্জন নয়; কান্না। দুঃখের কান্না, নিজেদের ভিটেমাটি উজাড় হওয়ার দুঃখ কিংবা খাবারের অভাবে ক্ষুধায় কাতর হয়ে কষ্টের কান্না। কিংবা মানুষ যে তাদের দেখলেই পিটিয়ে মারে, সেই দুঃখের আকুতি জানানোর জন্যই হয়তো এই কান্না।