একবার টয়লেট ফ্ল্যাশ করলে কতটুকু বিশুদ্ধ পানি নষ্ট হয়

ফ্ল্যাশের মাধ্যমে পানি অপচয়ের সমস্যাটির সমাধান করা খুবই জরুরিছবি: ফ্রি-পিক

শিরোনামটা পড়ে অনেকে ভাবতে পারো, এ আবার কেমন কথা! টয়লেটে ফ্ল্যাশ করলে কতটুকু বিশুদ্ধ পানি নষ্ট হয়, তা নিয়ে আবার আলোচনা করার কী আছে? কিন্তু বিষয়টি আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রতিদিন যে পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করি, তার একটি বড় অংশ খরচ হয় টয়লেটে ফ্ল্যাশ করার জন্য। এই পানির অপচয় রোধ করতে পারলে বিশুদ্ধ পানির অভাব কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।

পশ্চিমা বিশ্বে একটি পরিবার প্রতিদিন যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খরচ হয় টয়লেট ফ্ল্যাশ করার জন্য। যুক্তরাজ্যের টয়লেটগুলোয় প্রতিদিন প্রায় ৪০ কোটি লিটার (৮৮ মিলিয়ন গ্যালন) পানি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের শহর অঞ্চলেও যদি একই রকম সমীক্ষা চালানো হয়, তাহলে সেখানেও প্রায় একই রকম সংখ্যা দেখা যেতে পারে। টয়লেট ফ্ল্যাশ করার জন্য প্রচুর পানি খরচ হয় যা হয়তো অনেকেরই অজানা।

প্রতিবার ফ্ল্যাশ করার সময় গড়ে ছয় থেকে নয় লিটার পানি পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থায় চলে যায়। তাই এই পরিমাণ পানি অপচয়ের সমস্যাটির সমাধান করা খুবই জরুরি। একটি পানি সরবরাহকারী সংস্থা জানিয়েছে, ডুয়াল-ফ্ল্যাশ টয়লেটগুলো এখন পানি সাশ্রয় করার পরিবর্তে বেশি পানি নষ্ট করছে। এর কারণ হলো টয়লেটগুলোয় প্রায়ই লিকেজ হয় এবং এর ফ্ল্যাশ করার বোতামগুলো ব্যবহার করাও বেশ কঠিন। যার ফলে প্রায়ই বেশি পানি খরচ হয়ে যায়।

টয়লেট ফ্ল্যাশিং সিস্টেম বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এর মধ্যে বহুল ব্যবহৃত ফ্ল্যাশিং সিস্টেম হলো ডুয়াল-ফ্ল্যাশ। এই টয়লেটে দুই ধরনের ফ্ল্যাশের ব্যবস্থা থাকে। একটি ছোট ফ্ল্যাশ যা সাধারণত চার লিটার পানি ধারণ করে এবং একটি বড় ফ্ল্যাশ যা সাধারণত ছয় লিটার পানি ধারণ করে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা শুধু প্রস্রাব বা মলের জন্য প্রয়োজনীয় পানি ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ, প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট বা বড় ফ্ল্যাশ ব্যবহার করে পানি সাশ্রয় করা যায়।

তবে পানি সাশ্রয় করার জন্য কাজ করা একটি সংস্থা ওয়াটারওয়াইজ মনে করে যে ৫ থেকে ৮ শতাংশ টয়লেটে লিকেজ আছে। এই লিকেজের বেশির ভাগই হয় ডুয়াল-ফ্ল্যাশ টয়লেটে। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় পানি ও পয়োনিষ্কাশন সংস্থা টেমস ওয়াটারের পানি দক্ষতা ব্যবস্থাপক অ্যান্ড্রু টেকার বলেন, যেসব বাথরুম এখন আর ব্যবহৃত হচ্ছে না, তবে বাথরুমে পানির সংযোগ রয়েছে, এসব স্থানের কারণে অপচয়ের সমস্যা আরও বেড়ে যাচ্ছে। মূলত ফ্ল্যাশের চেয়ে লিকেজ বেশি পানি অপচয় হয়।

আরও পড়ুন

এডিনবরা, কার্ডিফ, বেলফাস্ট, ম্যানচেস্টার, শেফিল্ড, লিভারপুল ও ব্রিস্টল শহরে মোট জনসংখ্যা প্রায় ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন। এসব শহরে প্রতিদিন যে পরিমাণ পানি সরবরাহ করা হয়, তার মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন লিটার (৮৮ মিলিয়ন গ্যালন) পানি নষ্ট হয়ে যায়। সম্ভবত পাইপলাইনে লিকেজ, অপচয় কিংবা অন্য কোনো কারণে এই পানি নষ্ট হয়। বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ। এখানে যেখানে-সেখানে বাড়ি তৈরি করা হয়, পানির লাইন ও ড্রেনেজ সিস্টেমের পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে করা হয় না। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। বছরের পর বছর ধরে বড় ধরনের লিকেজ না হলে পানির লাইনগুলো মেরামত করা হয় না বললেই চলে।

ডুয়াল-ফ্ল্যাশ টয়লেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ড্রপ ভালভ সিস্টেম যা পানি সাশ্রয়ে সাহায্য করে। এই সিস্টেম ২০০০ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে এটি অন্যান্য দেশেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়।

বাথরুম সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক সমিতি (বিএমএ) স্বীকার করেছে, ড্রপ ভালভ সিস্টেম যদি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয়, তাহলে প্রচলিত সাইফন পদ্ধতির চেয়ে বেশি লিক হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। অর্থাৎ, যেগুলোয় ডুয়াল ফ্ল্যাশের ব্যবস্থা থাকে, সেগুলোয় যদি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা হয়, তাহলে সাধারণ টয়লেটের চেয়ে বেশি পানি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ, ড্রপ ভালভ সিস্টেমে লিক বেশি হয়। এ জন্য রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকমতো করা দরকার।

কীভাবে বুঝবে যে তোমার বাসার টয়লেটে লিকেজ আছে? লিকেজ সাধারণত দেখা যায় না। তবে কমোডে সামান্য পানির ধারা দেখা যেতে পারে। কিছু পানি সংস্থা পরামর্শ দেয় যে ফ্ল্যাশ করার ৩০ মিনিট পর কমডের পিছনের অংশ শুকিয়ে নিতে হবে। রাতে সেখানে একটুকরা টয়লেট পেপার রেখে দিতে হবে। যদি সকালে সেটি ভিজে যায় বা ছিঁড়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে যে লিকেজ আছে।

এ ছাড়া টয়লেটে লিকেজ আছে কি না, তা জানার জন্য দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রথমত, কিছু বিশেষ স্ট্রিপ পাওয়া যায় যা টয়লেটের পানিতে রাখলে লিকেজ থাকলে রং পরিবর্তন করে। দ্বিতীয়ত, টয়লেটের ফ্ল্যাশের ট্যাঙ্কে রং মেশানো যেতে পারে এবং কিছুক্ষণ পর দেখতে হবে সেই রং টয়লেটের প্যানে দেখা যাচ্ছে কি না। যদি দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে যে লিকেজ আছে।

এই লিকেজ রোধে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় প্লাম্বিং সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর একটি টমাস ডুডলি লিমিটেড একটি টেস্টিং স্টেশন রেখেছে। টেস্টিং স্টেশনে তারা নতুন কোনো মেকানিজম তৈরি করলে সেটি দুই লাখবার ক্রমাগত ফ্ল্যাশ করার মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখে। এই পরীক্ষা করতে প্রায় চার মাস সময় লাগে। পানি অপচয়ে পানির চাহিদা মেটাতে চাপ গিয়ে পড়ে নদী-নালার ওপর। এ জন্য পানি সাশ্রয় করার জন্য সচেতন হওয়া সবচেয়ে জরুরি।

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন