আমরা সবাই জিনিয়াস। আমাদের সবার মধ্যে সফলতার জিন আছে। কিন্তু জিনিয়াস হিসেবে যিনি গণ্য হন, তিনি কী করেন? আর আমরা যারা সাধারণ মানুষ হিসেবে মাঝখানে পড়ে থাকি, তারা কী করি! এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন মার্কিন লেখক-গবেষক ডেভিড শেঙ্ক। বইটির নাম ‘দ্য জিনিয়াস ইন অল অব আস’।
ডেভিড শেঙ্ক তাঁর বইয়ে ভুবনবিখ্যাত বেসবল খেলোয়াড় টেড উইলিয়াম সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। সবাই বলতেন, টেড ইউলিয়ামস জন্মগত প্রতিভা। তিনি বেসবলটাকে অন্যদের তুলনায় বড় দেখতে পান। টেড উইলিয়ামস বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেছেন, ‘আমি যদি অন্যদের তুলনায় বেসবল বড় দেখতে পাই, তার একমাত্র কারণ আমি অনেক বেশিক্ষণ, অনেক পরিশ্রম করে প্র্যাকটিস করেছি।’
Shenk reads a section from his book, THE GENIUS IN ALL OF US, about the baseball champion Ted Williams. The lesson? With practice-practice-practice, new science tells us you, too, can be a champion.
সাকিব আল হাসান চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড় হয়েছিলেন। কারণ, তিনি সারাক্ষণ ব্যাট–বল নিয়ে পড়ে থাকতেন। মাগুরা থেকে তিনি বিকেএসপিতে এসেছিলেন ক্রিকেট শিক্ষা নিতে। চার বছর আগে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের আগে আইপিএলে যখন তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল, তিনি জিমে গিয়ে পড়ে থাকতেন। তাঁর পছন্দের কোচ সালাহউদ্দিনকে উড়িয়ে নিয়ে তিনি কঠোর অনুশীলন করেছিলেন।
এবার কেন তিনি পারছেন না? এক. বয়স হয়ে গেছে। দুই. ক্রিকেট এখন তাঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান নয়। নিউজিল্যন্ডের সঙ্গে ওডিআই সিরিজের সময় ছুটি নিয়েছিলেন সাকিব। বিশ্রাম দরকার। তিনি আসলে বিশ্রাম করেননি। দিবারাত্রি বিজ্ঞাপনের শুটিং করেছেন। পার্থক্য পরিষ্কার। তুমি যাতে সফল হতে চাও, তোমাকে তার ভেতরেই থাকতে হবে, আর অনুশীলন করতে হবে।
৩১ অক্টোবর ২০২৩ কলকাতায় ইডেন গার্ডেনে খেলা শুরুর আগে দুই দলই প্রাকটিসে নেমেছিল। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং সিরিয়াসলি অনুশীলন করছিল পাকিস্তানিরা। বাংলাদেশিদের কাঁধ ছিল ঝোলানো। সাকিব ব্যাটিং প্র্যাকটিস করছিলেন খেলতে নামার পর, ব্যাটিংয়ের সময় ননস্ট্রাইকিং প্রান্তে এসে, অথবা একটা বল খেলার পর, শূন্যে ব্যাট চালিয়ে। এই প্র্যাকটিসটা কি তিনি নিউজিল্যান্ড সিরিজের সময় করতে পারতেন না?
বিশ্বকাপের আগে আমরা জানতাম না, আমাদের অধিনায়ক কে। দলের মধ্যে কলহ। এক খেলোয়াড় আরেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে কথা বলেন না। তামিম সিরিজের মধ্যে ঘোষণা দিয়ে দেন, তিনি আর খেলবেন না। প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তারপর তিনি আবার অনলাইনে লাইভ করেন। সাকিব, নতুন অধিনায়ক, সেই লাইভের প্রশ্নগুলোর উত্তর আগেই রেকর্ড করে রাখেন। কোনো দল এরকম হতে পারে? কোনো নিয়মকানুন থাকবে না!
শ্রীলঙ্কা যেবার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, সেবার তারা এক দল এক বছরের বেশি সময় ধরে একসঙ্গে খেলেছে। সবাই দুই খেলোয়াড়ের বাড়িতে ৮–১০ জন করে একসঙ্গে ঘুমাতেন। জার্মানি ব্রাজিলের মাটিতে ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারিয়েছিল যেবার, সেবার তারা ব্রাজিলে দ্বীপ ভাড়া করে একসঙ্গে থেকে প্র্যাকটিস করেছে। আর আমাদের অধিনায়ক আগের সিরিজে বিশ্রামের নামে বিজ্ঞাপনের শুটিং করলেন। নতুন অধিনায়কের উচিত ছিল দলের সঙ্গে থাকা। খেলুন না খেলুন, সবার সঙ্গে থেকে সবার মন বুঝবেন, সবাইকে সাহস দেবেন, ভরসা দেবেন, চাঙ্গা রাখবেন।
আমাদের বিশ্বকাপের দলটা হয়েছে কচিকাঁচার আসর। কে কোন পজিশনে খেলবেন, আগে থেকে ঠিক করা নেই। টপ অর্ডার ব্যাটাররা নামেন, আর আউট হন।
আসলে, জীবনের সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে ক্রিকেটে ভালো করা যায় না। আমরা কি অলিম্পিকে কোনো দিনে একটা ব্রোঞ্জ মেডেলরও কাছাকাছি যেতে পেরেছি?
তার ওপর আছে অনিয়ম, সুশাসনের অভাব। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট লিগে প্রকাশ্য দুর্নীতি হয়। ম্যাচ পাতানো হয়। আম্পায়ররা প্রকাশ্যে কারচুপি করেন।
ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়মে আমরা আগে চ্যাম্পিয়ন হতাম। এখন হয়তো সেরা দশে থাকি। ব্যাংক থেকে অনামা প্রতিষ্ঠান শত কোটি টাকা তুলে নিয়ে যায়। ক্রিকেটাররাও কি অর্থের লোভে পড়েন না? কেউ গিয়ে ব্যাংক চান, কেউ পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য তদবির করেন। কেউবা শেয়ারবাজারে কারসাজির ভেতরে গিয়ে পড়েন। কেউবা এমপি হতে চান। সব সহজ। টাকা সহজ। পদ সহজ। নির্বাচন সহজ। ব্যাংকের মালিক হওয়া সহজ। তাহলে কেন একজন খেলোয়াড় মন দিয়ে খেলবেন? তিনি তো অন্য যেকোনো ধান্ধা করলে বেশি ভালো করবেন! যেখানে টাকা আর ক্ষমতাই সর্বক্ষমতার অধিকারী।
নতুন খেলোয়াড় তৈরির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ক্রিকেট বোর্ডের নেই। বর্তমান খেলোয়াড়দের জন্য কাউন্সেলর নেই। দলের মধ্য ঐক্য নেই এবং খেলায় মন নেই। আমরা যে পারি, আমরা যে পারব, এই কথাটা বলার মতো মোটিভেটর নেই।
কেন একটি দল সফল হয়, এটাও যেমন এবারের বিশ্বকাপ থেকে শেখার আছে, তেমনি কেন একটা টিম ব্যর্থ হয়, সেটাও আমাদের দলের কাছ থেকে শিখতে পারি আমরা।
খেলা শুরুর আগে আমি একটা স্ট্যাটাস লিখেছিলাম, ‘তামিম ইকবাল আমাদের সেরা ব্যাটসম্যান। তাঁকে বাদ দিয়ে দল হলো, এ ছিল অকল্পনীয়! কিন্তু তিনি প্রথমে অধিনায়কত্ব ছেড়েছেন এই অভিমান থেকে যে তাঁর যে পিঠে সমস্যা আছে, কেউ সেটা বুঝতে চান না। এরপর তিনি বলেছেন, তিনি পুরো ফিট না। সব ম্যাচে নাও খেলতে পারেন।’
আমার ক্রিকেট-বিশেষজ্ঞ বন্ধু বললেন, তিনি সৎ, অকপট, তা-ই এটা আগে বলে নিয়েছেন।
মাশরাফি কিংবা আমার আমার ক্রিকেটবোদ্ধা বন্ধুর মতে, যা বলার কথা কোচ এবং অধিনায়কের, তা বলে ফেললেন বিসিবি সভাপতি। তা–ও নাকি কোনো ভূমিকা ছাড়াই। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওপেন না করার কথা ভাবো। অভিমানী তামিম বলে ফেললেন, তাহলে আমাকে বাদ দিন। তাঁকে বাদ দেওয়া হলো।
এখন ‘কেঁদেও পাবে না তাকে বর্ষার অজস্র জলধারে।’
জনগণের দাবিতে, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তাকে হয়তো নেওয়া যেত, কিন্তু অধিনায়ক সাকিব প্রকাশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। আগে থেকেই দ্বন্দ্ব ছিল। এখন তা শত্রুতায় পর্যবসিত। তামিম অভিমানী। সাকিব শক্ত। এই দ্বন্দ্বের প্রভাব কি দলের ওপর পড়বে না? এভাবে একটা জাতীয় দল চলতে পারে?
ভালো হতো, যদি সাকিব–তামিম বন্ধু হয়েই থাকতেন দেশের স্বার্থে, তাঁরা দুজনেই দলে থাকতেন, পরস্পরের পাশে দাঁড়াতেন। কিন্তু ভালোটা হয়নি।
৯টা ম্যাচ খেলতে হবে বিশ্বকাপে, লম্বা এই সিরিজে ভালো করবে যারা ফিজিক্যালি ফিট—অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, এমনকি আফগানিস্তান। একেকজনের কী দারুণ ফিটনেস! ইংল্যান্ডও শক্তপোক্ত, কিন্তু তাদের আবার হোমসিকনেস রোগ আছে।
এই অবস্থায় অধিনায়কের সঙ্গে বনিবনা না হওয়া শতভাগ ফিটনেসহীন তামিমকে বাদ দেয়াটা হয়েছে মন্দের ভালো, বা ভালোর মন্দ। ভেবেছিলাম, ৯টা ম্যাচের দুটোতেও যদি বাংলাদেশ জেতে, তাহলেই আমাদের মনে করতে হবে, অনেক ভালো করেছে এবারের দল। বাংলাদেশ একটা ম্যাচ জিতেছে, এখন এটাকেই মনে হচ্ছে ভালো ফল। আফগানরা যেভাবে খেলছে, তাদের বিপক্ষে জয়টাকে তো এখন অঘটনই মনে হচ্ছে।
পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না নিয়ে, কলহ করে এসে যে ভালো করা যায় না, তা প্রমাণিত হলো আবারও। সাকিব প্রমাণ করলেন ডেভিড শেঙ্কের সেই কথাটাই, তুমিও জিনিয়াস হতে পারো, যদি তুমি অনুশীলন করো। তুমি অনুশীলন না করলে তুমিও সাধারণ। সাকিব বড় প্রতিভা নিয়েই এসেছিলেন, কিন্তু তিনি ২০২৩ বিশ্বকাপে প্রমাণ করলেন, অনুশীলন, নিয়মানুবর্তিতা, একাগ্রতা, সাধনা, আত্মত্যাগ, ধ্যান, মনোসংযোগ ছাড়া সফল হওয়া যায় না।