অনেকের কাছে কুকুর শুধু পোষা প্রাণী নয়, এরা পরিবারের সদস্যের মতো। এরা কথা বলতে না পারলেও অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ দিয়ে অনেক কিছু বোঝাতে পারে। কিন্তু আমরা কি এদের ভাষা বুঝতে পারি? কী চাচ্ছে পোষা প্রাণীরা? পোষা কুকুরের চাওয়া বিষয়ে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সবসময় নিজেদের পোষা কুকুরের এই সংকেতগুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারে না। এমনকি অনেক সময় লক্ষ্যও করে না। গবেষণাটি করেছে অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা। নতুন এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ১০ মার্চ অ্যানথ্রোজুস (Anthrozoös) জার্নালে। অ্যানথ্রোজুস জার্নালটি মূলত মানুষ ও প্রাণীর মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে।
গবেষকেরা একটি সমীক্ষায় চালিয়েছেন। তাঁরা কিছু ব্যক্তিকে কুকুরদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক আচরণের কয়েকটি ভিডিও দেখান। ভিডিওগুলোতে কুকুর বিভিন্ন জিনিসের প্রতি নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেছে। যেমন, কুকুরের বেধে রাখার লিশের প্রতি এর মনোভাব, কুকুররের খাবার, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার বা কুকুরকে বকাঝকা করার ভিডিও। ভিডিও দেখানোর পর ব্যক্তিদের বলা হয় কুকুরগুলো কেমন অনুভব করছে তা বলতে। কিন্তু দেখা গেল, লোকেরা কুকুরের আচরণ না দেখে, ভিডিওতে কী দেখানো হচ্ছে সেদিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। এমনকি ভিডিওগুলো এমনভাবে বানানো হয়, যেন কিছুটা ভুল অনুমান করে অংশগ্রহণকারীরা। যেমন, একটা ভিডিওতে কুকুরকে দেখে মনে হচ্ছিল যে লিশ দেখে খুশি হচ্ছে, তবে আসলে কুকুরকে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দেখানো হচ্ছিল। কুকুরের আসল আচরণ বুঝতে পারেনি কেউই।
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক ও গবেষণাপত্রের লেখক হলি মোলিনারো বলেছেন, ‘কুকুরের আবেগ বোঝার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়শই ভুল করি। আমরা মনে করি, আমরা বুঝি এরা কী বোঝাতে চাচ্ছে। কিন্তু আসলে আমাদের ধারণাগুলো অন্য অনেক বিষয় দিয়ে প্রভাবিত হয়।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘কুকুরের মালিকরা প্রায়ই কুকুরের আচরণ বুঝতে ভুল করেন। কারণ, তাঁরা পরিস্থিতি দেখে নিজেদের মতো ধারণা করে নেন। তাই কুকুরের আসল আচরণ বুঝতে হলে, এদের দিকে একটু বেশি মনোযোগ দিতে হবে।’
২০২১ সালে মোলিনারো কুকুরের আবেগ নিয়ে তাঁর পড়ালেখা শুরু করেন। তখন তাঁর মাথায় এই গবেষণার ধারণাটি আসে। কিন্তু তখন তিনি মহামারির কারণে সরেজমিনে গবেষণা করতে পারেননি। হলি মোলিনারো আগের করা কিছু গবেষণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন, যেখানে দেখা গেছে মানুষ অন্যদের আবেগ বোঝার সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। মহামারির সময় জুমের মতো ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে ব্যাকগ্রাউন্ড ঝাপসা করার সুবিধাটি তাঁর নজরে আসে। তিনি এবং তার গবেষণার অ্যাডভাইজার ক্লাইভ ওয়েনি চিন্তা করেন, তাঁরা এমন ভিডিও তৈরি করতে পারবেন কি না, যেখানে কুকুরের আশেপাশের পরিস্থিতি না দেখিয়ে শুধু এদের আচরণ দেখানো হবে। যেন চারপাশের অবস্থার তুলনায় এটি কী ভাবছে তা বোঝা যায়।
হলি মোলিনারো তাঁর গবেষণা শুরু করে তাঁর বাবা-মায়ের পোষা কুকুর অলিভারের আচরণের ভিডিও রেকর্ড করে। অলিভার ১৪ বছর বয়সী পয়েন্টার-বিগল মিক্স জাতের কুকুর। অলিভারের সঙ্গে তাঁর বাবার আলাপচারিতার দৃশ্য তিনি ভিডিওতে ধারণ করেন। কিছু ভিডিওতে, হলির বাবা এমন কিছু করতেন যা দেখে অলিভার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতো। যেমন, প্রিয় খেলনা দেখানো। আবার কিছু ভিডিওতে, তিনি এমন কিছু করতেন যা অলিভারের মধ্যে নেতিবাচক আচরণ সৃষ্টি করত। যেমন, আস্তে করে বকা দেওয়া বা তাঁর বিড়াল জাফরানের সঙ্গে পরিচয় করানো। হলি বলেন, ‘অলিভার বিড়ালটিকে একদম পছন্দ করত না।’
হলি মোলিনারো ভিডিও এডিটিং শিখে প্রতিটি ভিডিও এমনভাবে সম্পাদনা করেছেন, যেন কুকুরের আশেপাশের অন্য দৃশ্য দেখা না যায়। শুধু অলিভারের ফুটেজ রেখে, বাকি সব কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে করে দেন। গবেষকরা শত শত স্নাতক শিক্ষার্থীকে দুই ধরনের ভিডিও দেখান। প্রতিটি ভিডিওতে অলিভারের আচরণ দেখে মানসিক অবস্থা কেমন ছিল তা অনুমান করতে বলা হয়। প্রথম ভিডিওতে অলিভারের আশেপাশের পরিবেশও দেখানো হয়। দ্বিতীয় ভিডিওতে শুধু অলিভারকে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখানো হয়।
যখন শিক্ষার্থীরা প্রথম ভিডিও দেখে অলিভারের আবেগ অনুমান করে। তাঁরা বলেন, অলিভারের ইতিবাচক আবেগকে নেতিবাচক আবেগের চেয়ে বেশি ইতিবাচক বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু যখন তাঁরা দ্বিতীয় ভিডিও দেখেন, যেখানে শুধু অলিভারকে দেখা যায়, তখন তাঁরা অলিভারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক আবেগগুলোকে প্রায় একই রকম ইতিবাচক বলে মনে করেছেন।
এরপর, গবেষকরা ভিডিওগুলোকে আরও জটিল করে তোলেন। তাঁরা বিভিন্ন পরিস্থিতির ফুটেজ একসঙ্গে জুড়ে দেন। যেমন, অলিভার যখন লিশ দেখে খুশি হয়, সেই ফুটেজের সঙ্গে অলিভারকে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দেখানোর ফুটেজ জুড়ে দেওয়া হয়। ভিডিওতে হলির বাবাকে যখন ইতিবাচক কিছু করতে দেখা যায়, তখন দর্শক অলিভারের আবেগকেও ইতিবাচক বলে মনে করে। এমনকি অলিভার যদি নেতিবাচক কিছুতে আচরণ দেখায়, তবুও তাঁরা একই কথা ভেবেছে। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীরা অলিভারের আচরণের চেয়ে ভিডিওর আশেপাশের পরিবেশ দেখে বেশি প্রভাবিত হয়েছে।
ক্লাইভ ওয়েনি বলেছেন, ‘মানুষ প্রায়ই কুকুরের আচরণ না দেখে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে এদের আবেগ বোঝার চেষ্টা করে। ফলে, কুকুরের আসলে কি বোঝাতে চাচ্ছে এদের আচরণ দিয়ে তা তাদের চোখ এড়িয়ে যায়।’
গবেষকরা জানিয়েছেন, এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কেননা এই গবেষণায় শুধু একটি কুকুরের আচরণের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। তাই, অন্য কুকুরের ক্ষেত্রে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। আর মানুষ হয়তো নিজের কুকুরের আবেগ আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন।
তবুও, গবেষকেরা আশাবাদী এই গবেষণাটি পোষা প্রাণীর মালিকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হবে। উইনি জানিয়েছেন, ‘আমি আমার নিজের জীবনেও এটি মেনে চলার চেষ্টা করছি। আমি সম্প্রতি একটি রেসিং গ্রেহাউন্ড জাতের কুকুর দত্তক।’ মোলিনারো জানিয়েছেন, ‘দুঃখজনকভাবে, অলিভার এই গবেষণাটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই মারা গেছে। তবে ভালো লাগছে, অলিভার এই গবেষণার মাধ্যমে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইম্স, সিয়াটেল টাইম্স