বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহর আমাদের কী ক্ষতি করছে
গত সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঘুম থেকে জেগে ঢাকার বাসিন্দারা টের পান, বায়ুদূষণের মাত্রা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় প্রথম অবস্থানে আছে ঢাকা। সকাল ৯টায় ঢাকার বাতাসের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) স্কোর ছিল ৩৯২।
স্কোর অনুযায়ী এই বাতাস 'অত্যন্ত বিপজ্জনক'। এই বাতাস ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর আগেরদিন, রবিবার স্কোর ছিল ২০১। একিউআই হলো প্রতিদিনের বায়ুর মান নির্ধারণের সূচক। এটি দিয়ে একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটা বিশুদ্ধ বা দূষিত সে সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য স্বাস্থ্য প্রভাব নিয়েও জানা যায়।
যখন বাতাসের কণাদূষণের একিউআই মান ৫০ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকে, তখন বাতাসকে ধরা হয় 'মধ্যম মানের'। এই অবস্থায় সংবেদনশীল মানুষদের দীর্ঘ সময় ধরে ঘরের বাইরে থাকা উচিত নয়। মানে ধরো যাদের অ্যাজমা আছে, বা শিশু কিংবা বয়স্ক ব্যক্তি। এদেরকে দীর্ঘ সময় বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত রাখা উচিত। বায়ুমান ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে থাকলে বলা হয় 'সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর'। ১৫১ থেকে ২০০-এর মধ্যে থাকলে 'অস্বাস্থ্যকর'। আর ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকলে 'অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর'। ৩০১-এর ওপরে থাকলে 'বিপজ্জনক' বলে চিহ্নিত করা হয়। বিপজ্জনক বায়ু বাসিন্দাদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
সোমবার সকালে ভারতের দিল্লি, পাকিস্তানের লাহোর এবং ভিয়েতনামের হ্যানয় যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থানে ছিল। এসব এলাকার একিউআই স্কোর ছিল যথাক্রমে ২৬১, ২৫৮ এবং ১৮৭। গত একসপ্তাহ ধরে ঢাকার অবস্থান তালিকায় শীর্ষ পাঁচে থাকছে।
বাংলাদেশে একিউআই পাঁচটি দূষণকারী উপাদানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। কণাদূষণ পিএম১০ এবং পিএম২.৫, নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড এবং ওজোন গ্যাস।
এর মধ্যে পিএম২.৫ হলো আড়াই মাইক্রোমিটার বা এর কম ব্যাসের কণা। এটি এত সূক্ষ্ম কণা যা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে আমাদের ভেতরে প্রবেশ করে। ধোঁয়া, গাড়ি থেকে নির্গত গ্যাস বা কণা, নির্মাণ শিল্প থেকে এর উৎপত্তি হতে পারে। আর ওজোন স্তর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপরের অংশে থাকলে তাকে বলে ভালো ওজন। এই স্তর সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি আটকে দেয়। তবে ভূমির কাছাকাছি থাকলে ওজন স্তর বিপদের কারণ হতে পারে।
শীতকালে ঢাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণের সমস্যায় ভোগেন। এ সময় বায়ুর মান সাধারণত খুব খারাপ হয়ে যায়। বর্ষাকালে বায়ুর মান কিছুটা ভালো হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়। যার প্রধান কারণ স্ট্রোক, হৃদ্রোগ, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসজনিত রোগ (সিওপিডি), ফুসফুস ক্যান্সার এবং তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ।
বায়ুদূষণ সাধারণ চোখে অনেকসময় অদৃশ্য হলেও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। গবেষণা বলছে, বর্তমানে বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর আগের চেয়ে আরও বেশি উপায়ে প্রভাব ফেলছে। লাখ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন এখন হুমকির মুখে। দূষিত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে ভয়ংকর ১০ স্বাস্থ্যঝুঁকির তালিকা এখানে দেওয়া হলো।
ভয়ংকর ১০ স্বাস্থ্যঝুঁকি
১. অকাল মৃত্যু: গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি, উভয় প্রকারের দূষিত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে জীবনকাল কমে যেতে পারে। অকাল মৃত্যুর কারণ হতে পারে দূষিত বাতাস। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এই তথ্য বহু বছর ধরেই জানেন।
২. অ্যাজমা আক্রমণ: ওজোন ও বায়ুর কণাদূষণ শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে অ্যাজমার আক্রমণ বাড়তে পারে। এর ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া এবং স্কুল বা কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত না হতে পারার ঘটনা খুব সাধারণ।
৩. হৃদ্রোগ: বায়ুদূষণ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৪. ফুসফুস ক্যান্সার: ২০১৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করেছে, বায়ুর কণাদূষণ ফুসফুস ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ এটি।
৫. শ্বাসযন্ত্রের বিকাশে বাধা: বায়ুদূষণের সংস্পর্শে আসলে শিশুদের ফুসফুসের বৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে বা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে শিশুদের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তী জীবনে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যায়।
৬. সংক্রমণের ঝুঁকি: বায়ুদূষণ ফুসফুসের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।
৭. সিওপিডি রোগের অবনতি: যারা দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসজনিত রোগ যেমন ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) নিয়ে বসবাস করছেন, তাদের জন্য বায়ুদূষণ শ্বাস নেওয়া আরও কঠিন করে তুলতে পারে। মারাত্মক উপসর্গের কারণে এদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা মৃত্যুও হতে পারে।
৮. ফুসফুসের টিস্যুতে ফোলাভাব ও জ্বালাপোড়া: সুস্থ ফুসফুসের মানুষও এই সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। তবে যাদের অ্যাজমা বা সিওপিডির মতো ফুসফুসের রোগ আছে, তাদের জন্য এই সমস্যা আরও গুরুতর হতে পারে।
৯. নবজাতকের কম ওজন: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণের কারণে কম ওজনের নবজাতক জন্মানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে, এমনকি শিশু মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
১০. শ্বাসকষ্ট, কাশি ও বুকে চাপ লাগা: এই উপসর্গগুলো দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি—উভয় প্রকার দূষণের কারণেই হতে পারে।
এই তালিকা এখানেই শেষ নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বায়ুদূষণের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্কও রয়েছে। বিজ্ঞানীরা যত গবেষণা করছেন, তত নতুন নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি আমাদের সামনে উঠে আসছে। ভয়াবহ বিপদ হয়ে উঠছে বায়ুদূষণ।
আমাদের দেশে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি দূষণ বাড়াতে ভূমিকা রাখা বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এই বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করা উচিত, যেন আমরা পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ বাতাসে শ্বাস নিতে পারি।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, আইকিউএয়ার ও আমেরিকান লাঙ অ্যাসোসিয়েশন