ডিম তো আমরা প্রায় প্রতিদিনই খাই। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় এটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ডিম শুধু প্রোটিনের একটি চমৎকার উৎস নয়, বরং ভিটামিন, মিনারেল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানেও ভরপুর। অনেকের দিন শুরুই হয় ডিম দিয়ে। কেউ পছন্দ করেন ডিমের অমলেট, কেউ ডিম পোচ, আবার কারো প্রিয় ডিমের কোরমা। আবার কেউ হাফ বয়েল, ফুল বয়েল বা ক্রিম বয়েল ডিম খেতে ভালোবাসেন।
কিন্তু ডিম সিদ্ধ করা একটি সাধারণ কাজ হলেও নিখুঁতভাবে ডিম সিদ্ধ করা অনেকের কাছেই একটি কঠিন কাজ। যাদের ডিম সিদ্ধ পছন্দ তারাও প্রায়ই নিখুঁতভাবে ডিম সিদ্ধ করতে পারেন না। ডিমের ভেতরের কুসুম ও সাদা অংশ সমানভাবে সিদ্ধ না হলে ডিম খাওয়ার স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডিম সিদ্ধ করার একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। তাঁরা বলছেন, নিখুঁতভাবে ডিম সিদ্ধ করতে হলে কমপক্ষে ৩০ মিনিট সময় লাগে। এই পদ্ধতিতে ডিমকে বিভিন্ন তাপমাত্রার মধ্যে বারবার পরিবর্তন করতে হয়। তাই বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন নিখুঁতভাবে ডিম সিদ্ধ করার জন্য কিছু বিশেষ কৌশল ও পদ্ধতি অনুসরণ করা কথা।
ডিমের কুসুম ও সাদা অংশ ভিন্ন তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় নিখুঁতভাবে সিদ্ধ হওয়ার জন্য। ডিমের কুসুম রান্না করার জন্য প্রায় ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। যেখানে ডিমের সাদা অংশ জন্য প্রায় ৮৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। এই কারণে ডিম সিদ্ধ করার সময় উভয় অংশের সঠিক তাপমাত্রা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নতুন গবেষণাপত্রে ইতালির পোজুওলিতে ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের বিজ্ঞানী পেলেগ্রিনো মুস্তোর নেতৃত্বে গবেষকরা প্রথমে কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড ডাইনামিকস (সিএফডি) ব্যবহার করে ডিম রান্নার প্রক্রিয়াটির একটি মডেল তৈরি করেন। সিএফডি হলো এমন একটি কম্পিউটার সিস্টেম যা ব্যবহার করে তরল ও গ্যাস কীভাবে প্রবাহিত হয় তা অনুমান করতে পারে বিজ্ঞানীরা। এটি পর্দাবিজ্ঞানের ভর, বেগ ও শক্তি সংরক্ষণের উপর ভিত্তি করে কাজ করে।
সিমুলেশনে বিজ্ঞানীরা এই নতুন পদ্ধতিটি পেয়েছেন। যা সম্ভবত বেশিরভাগ শেফ ও বাবুর্চিদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। যা ব্যবহার করলে নিখুঁত ডিম সিদ্ধ করা যাবে। এই পদ্ধতিটি কে গবেষকরা ‘পর্যায়ক্রমিক রান্না’ বলে অভিহিত করেছেন।
পর্যায়ক্রমিক রান্না পদ্ধতিতে প্রথমে ডিমটিকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ফুটন্ত পানির পাত্রে রাখা হয়। এরপর সেটিকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম পানিতে রাখা হয়। এভাবে উভয় তাপমাত্রার মধ্যে ডিমটিকে কিছুক্ষণ পরপর পরিবর্তন করা হয়। সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়ার জন্য ডিমটিকে ৩২ মিনিটের জন্য প্রতি দুই মিনিট অন্তর এই দুটি তাপমাত্রার মধ্যে পরিবর্তন করতে হবে। এই পদ্ধতিতে ডিম সেদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট মনোযোগ এবং সময় প্রয়োজন। ডিম সিদ্ধ করার এই জটিল প্রক্রিয়াটি হয়তোবা দৈনন্দিন রান্নার জন্য খুব একটা মানানসই নাও হতে পারে। তবে নিখুঁত ডিমের স্বাদ পেতে হলে এটা একবার করেই দেখা যেতে পারে।
গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো বিজ্ঞানীরা যখন এই নতুন পদ্ধতিটি বাস্তবে প্রয়োগ করেন। গবেষকরা দেখতে পায় এই পদ্ধতিতে সিদ্ধ করা ডিম শুধু সুস্বাদুই নয়, স্বাস্থ্যকরও বটে।
গবেষকরা পারমাণবিক চৌম্বকীয় অনুরণন (NMR) ও উচ্চ-রেজোলিউশন ভর স্পেকট্রোমেট্রি ব্যবহার করে তাঁদের নিখুঁতভাবে সিদ্ধ করা ডিমের গঠন, সংবেদনশীল গুণাবলি এবং রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এই গবেষণার ফলাফল থেকে প্রমাণিত হয় সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে ডিম সিদ্ধ করলে এর স্বাদ এবং পুষ্টিগুণ দুটোই থাকে অনেক বেশি।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে পর্যায়ক্রমে রান্না করা ডিমের কুসুমে অন্যান্য পদ্ধতিতে রান্না করা ডিমের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি পলিফেনল (Polyphenol) থাকে। পলিফেনল হলো এক শ্রেণীর মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট যা সাধারণত উদ্ভিদে পাওয়া যায় যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এই যৌগগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্যের জন্য বিখ্যাত। উদ্ভিদ তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে এই যৌগ তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে পলিফেনল মানবদেহের জন্যও উপকারী। যেমন, মহামারি সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে যে পলিফেনলের উচ্চ খাদ্য গ্রহণ কার্ডিওভাসকুলার রোগ, ক্যান্সারের নির্দিষ্ট রূপ ও নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
সূত্র: বিবিসি, দ্য টেলিগ্রাফ, নিউ সায়েন্টিস্ট