ধ্বংসস্তূপের মাঝে শিশুদের ঈদ যেভাবে আসে
বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে কি আনন্দ উদ্যাপন করা যায়? ধরা যাক, তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, সেখানে যেকোনো সময় হামলা হতে পারে। কেউ এসে নির্বিচারে তোমাকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। এই সময় তুমি কি কোনো কিছু নিয়ে উল্লাস করতে পারবে?
জবাব হতে পারে, পারব না।
সত্যি তা–ই। মনে ভয় কিংবা শঙ্কা নিয়ে কোনো আনন্দ উদ্যাপন করা যায় না। এমনটাই ঘটছে ফিলিস্তিনি শিশুদের সঙ্গে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকেই সারাক্ষণ এমন ভয়ের মাঝে রয়েছে গাজার শিশুরা।
শুধু কি ভয়? না। ক্ষুধার জ্বালা, ভাই-বোন, পরিবার হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে হাজারো শিশু রাত্রি যাপন করছে গাজায়।
গাজার শিশুদের পরিস্থিতি তুলে ধরে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি হিসাব দিয়েছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। তাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, সেখানকার ১৭ হাজার শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। ইউনিসেফ বলছে, যে শিশুরা তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই করুণ গল্প আছে। এই শিশুদের অনেকেরই মা-বাবা মারা গেছেন। অনেকেই বাধ্য হয়েছে মা-বাবা থেকে আলাদা হতে।
এখানে আরেকটি তথ্য জানা দরকার। গাজার ১৭ লাখ মানুষ এখন ঘরহারা। তারা সবাই আশ্রয় নিয়েছিল আশ্রয়শিবিরে। কিন্তু সেখানেও তো নিয়মিত বোমা হামলা চলে। অথচ আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোথাও যুদ্ধ চললেও আশ্রয়শিবির বা শরণার্থীশিবিরে কোনো বোমা হামলা করা যাবে না। এই নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করছে না ইসরায়েল। নির্বিচার তারা মানুষ মারছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি মারা গেছে। আর আহত হয়েছে প্রায় সোয়া লাখ মানুষ। আর এর অর্ধেকই নারী ও শিশু। এদের মধ্যে অনেকেই চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে, অনেকেই পঙ্গু হয়েছে। এদের অধিকাংশই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না।
লি আরও লিখেছেন, মানুষের যে ভাষায় প্রকাশ না করার মতো যন্ত্রণা হতে পারে, সেটা গাজায় গেলে খানিকটা বোঝা যায়। সেখানে ১৮ লাখ মানুষ গৃহহীন। তারা যেখানেই পারছে আশ্রয় খুঁজছে।
২০২৪ সালের শুরুর দিকে ইউনিসেফের হয়ে জনাথন নামের এক ভদ্রলোক গাজায় গিয়েছিলেন সেখানকার অবস্থা দেখতে। তিনি ফিরে এসে লিখেছেন, ‘আমি সেখানে ১২টি শিশুর সঙ্গে দেখা করেছি বা সাক্ষাত্কার নিয়েছি। তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু এই যুদ্ধে পরিবারের একজন সদস্যকে হারিয়েছে। এই ১২ জনের চারজন মা-বাবাকে হারিয়েছে। এই ১২টি শিশুর মধ্যে দুটি তাদের মা এবং তাদের বাবা দুজনকেই হারিয়েছে। এই পরিসংখ্যানের প্রতিটির পেছনে রয়েছে একটি শিশু যে এই ভয়ংকর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শরণার্থীশিবিরে এসেছে৷
জনাথন ইউনিসেফের কাছে যে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন, সেখানে রাজান নামের ১১ বছরের এক শিশুর কথা লিখেছেন। তিনি লিখেছেন যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহের কথা। রাজান তার পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার এক আত্মীয়ের বাসায় ছিল। সেখানে বোমা হামলা হয়। এই হামলায় রাজানের পারিবারের সবাই মারা যায়। তার মা, বাবা, ভাই, দুই বোন—সবাই মারা যায় ইসরায়েলের ওই হামলায়। রাজানের মতো অনেক শিশুই গাজায় এখন শরণার্থীশিবিরে থাকছে, যারা বড় হচ্ছে মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে।
জনাথন জানান, গাজার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ভয়ংকরভাবে উদ্বিগ্ন থাকে তারা। এ কারণে তাদের ক্ষুধা কমে গছে। তারা ঘুমাতে পারে না। শিশুরা যখনই বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পায়, তখন তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এবার আরেকজনের অভিজ্ঞতার কথা জানা যাক। তাঁর নাম জেসন লি। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সেভ দ্য চিলড্রেনের হয়ে কাজ করেন তিনি। যুদ্ধের মধ্যে গাজার পরিস্থিতি দেখতে সেখানে গিয়েছিলেন। কাতারের গণমাধ্যম আল-জাজিরায় তিনি লিখেছেন, ‘আমি এক সপ্তাহ গাজায় কাটিয়েছি। সেখানে আমি দেখেছি একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি কীভাবে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। গাজার দক্ষিণে একটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করার সময় আমি একটি পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তারা তাদের ছোট শিশুর জন্য দুধ খুঁজছে। কারণ, শিশুটির মা মারা গিয়েছিল ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। ফলে শিশুটির জন্য দুধের ব্যবস্থা করতে হচ্ছিল। তবে গাজায় তখন দুধের সংকট চলছে।’
লি আরও লিখেছেন, মানুষের যে ভাষায় প্রকাশ না করার মতো যন্ত্রণা হতে পারে, সেটা গাজায় গেলে খানিকটা বোঝা যায়। সেখানে ১৮ লাখ মানুষ গৃহহীন। তারা যেখানেই পারছে আশ্রয় খুঁজছে।
লি লিখেছেন, একটি ছোট্ট শিশু হয়তো বুঝতে পারে না তার আশপাশে কী ঘটছে। কিন্তু সে তার চারপাশে ধ্বংসস্তূপ দেখতে পায়। তারা দেখছে কীভাবে তাদের বাড়িঘর, স্কুল ধ্বংস হয়ে গেছে; তারা তাদের চারপাশে যা ঘটছে, বিমান হামলা, সাহায্যের জন্য চিৎকার সবকিছু শুনতে পায়। তারা এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ দেখে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং তারা ভয় পায়। তারা আসলে অসহায়।
এখন অবশ্য এমন হামলা কমে এসেছে। কিন্তু মানুষের কষ্ট কি কমেছে? না। ইসরায়েল সম্প্রতি হামলা বন্ধ করার পর অনেকেই আশ্রয়শিবির ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে আসলে কিছু নেই। সব বোমার আঘাতে ভেঙে গেছে। অনেকে তার বাড়ি চিনতে পারছে না। অনেকের ক্ষেত্রে এমনও হচ্ছে, ওই ধ্বংসস্তূপ সরাতে গিয়ে আত্মীয়স্বজনের লাশ খুঁজে পাচ্ছেন।
এই যে সব হারিয়ে, আত্মীয়স্বজন, মা-বাবাকে হারিয়ে কি ঈদের আনন্দ খুঁজে পাওয়া যাবে? কেউ মাকে হারিয়েছে, কেউ বাবাকে হারিয়েছে, এখন শরণার্থীশিবির থেকে কখন খাবার দেবে, সেই খাবারের জন্য অপেক্ষা করে কি ঈদ উদ্যাপন করা যাবে?
ধরা যাক কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। তখন সবাই কী করে? কেউ ছাতা মেলে, কেউ কোথাও আশ্রয় নেয়, যাতে বৃষ্টিতে না ভেজে। ভেবে দেখো তো, এই বৃষ্টির ফোঁটার বদলে আকাশ থেকে বোমা পড়ছে আর একের পর এক ভবন ধসে যাচ্ছে। এর মাঝে কি ঈদের আনন্দ আসবে?