মাঠে যদি কোনো ঘোড়া থাকে, তাহলে একটা ব্যাপার খেয়াল করবে—এরা বেশিরভাগ সময় দাঁড়িয়ে ঘুমায়। রাতেও যদি কখনো খেয়াল করো, দেখবে ওরা মাটিতে শোয়ার চেয়ে বেশিরভাগ সময় পায়ে ভর দিয়ে বিশ্রাম নেয়। কিন্তু কেন? মাটিতে শুয়ে ঘুমানো কি ওদের জন্য আরামদায়ক নয়?
আসলে এর পেছনে আছে ঘোড়ার বেঁচে থাকার কৌশল। ঘোড়া সাধারণত দাঁড়িয়ে ঘুমায়, কারণ এটা এদের শিকারী প্রাণীদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। ঘোড়ার দৌঁড়ানোর ক্ষমতা চমৎকার। আর সেই ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর জন্যই এরা দাঁড়িয়ে ঘুমাতে শেখে। বিষয়টা একটু খুলেই বলি!
ঘোড়া তৃণভোজী প্রাণী। মানে এরা ঘাস লতাপাতা খায়। জঙ্গলে বাঘ, সিংহের মতো অনেক মাংসাশী প্রাণী ওদের শিকার করার জন্য ঘুরে বেড়ায়। যদি ঘোড়ারা মাটিতে শুয়ে ঘুমায়, তাহলে শিকারীরা খুব সহজেই তাদের আক্রমণ করতে পারবে।
দাঁড়িয়ে থাকলে ঘোড়ারা বিপদ দেখলে খুব দ্রুত দৌড় দিতে পারে। কিন্তু শুয়ে থাকা অবস্থায় উঠতে বেশি সময় লাগে। দেখা গেল শোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে শিকারী ওদের ধরে ফেলল। তাহলেই তো কেল্লা ফতে! তাই দাঁড়িয়ে থাকাটা ওদের জন্য একটা সুরক্ষা কবচ।
তবে এর মানে এই না, ঘোড়া কখনোই শোয় না। এরা আসলে দুই ধরনের ঘুম ঘুমায়। হালকা ঘুম ও গভীর ঘুম। ওদের দাঁড়িয়ে ঘুমানোটা হলো হালকা ঘুম। আর গভীর ঘুম ঘুমানোর সময় এরা শুয়ে বিশ্রাম নেয়। গভীর ঘুমের সময় প্রাণীরা স্বপ্ন দেখে। ঘুমের এই পর্বকে বলে রেম স্লিপ, মানে র্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ। গভীর ঘুমের জন্য ঘোড়াকে অবশ্যই শুয়ে পড়তে হয়।
ভাবতে পারো, দাঁড়িয়ে ঘুমালে কি ঘোড়াদের কষ্ট হয় না? আসলেই ওদের কষ্ট হয় না। কারণ ঘোড়ার শরীরে বিশেষ কিছু জিনিস আছে, একে বলে ‘স্টে অ্যাপারেটাস’। বিশেষ জিনিসটা হলো ওদের পায়ের রগ ও হাড়ের গঠন। যাকে বলে লিগামেন্ট ও টেন্ডন। একটা হাড়ের সঙ্গে আরেকটা হাড় জুড়ে দেয় যে তন্তু, সেটাই লিগামেন্ট। আর টেন্ডন হলো যা পেশিকে হাড়ের সঙ্গে যুক্ত করে। এই টেন্ডন ও লিগামেন্টের কারণে ঘোড়া পায়ের পেশি তেমন ব্যবহার না করেই শরীরের ভর সামলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। আমরা যেমন কোনো কিছুর সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়ালে কম শক্তি খরচ হয়, অনেকটা তেমনই।
পূর্ণবয়স্ক ঘোড়ারা দিনে ৫ ঘণ্টার মতো ঘুমায়। এর মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই এরা দাঁড়িয়ে ঘুমায়। তবে এদের সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন অন্তত ২৫ মিনিটের মতো গভীর ঘুমের প্রয়োজন। আর সেজন্য ঘোড়াদের একটু হলেও মাটিতে শুয়ে ঘুমাতে হয়।
যদি কোনো ঘোড়ার যথেষ্ট গভীর ঘুম না হয়, তাহলে ওদের স্বাস্থ্য খারাপ হতে পারে। এমনকি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ঘুমের অভাবে হঠাৎ পড়ে যেতে পারে মাটিতে।
তাই ঘোড়াদের নিরাপদ বোধ করাটা খুব জরুরি। শিকারের আক্রমণের ভয় না থাকলে এরা নিশ্চিন্তে মাটিতে শুয়ে গভীর ঘুম ঘুমাতে পারে। বুনো ঘোড়ারা যখন গভীর ঘুমে থাকে, তখন অন্য ঘোড়ারা দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়, যাতে কোনো বিপদ এলে সবাই পালাতে পারে। যদি কোনো ঘোড়া একা থাকে বা নিরাপদ বোধ না করে, তাহলে সে সহজে মাটিতে শুতে চায় না।
তবে শুধু ঘোড়াই যে দাঁড়িয়ে ঘুমায় এমন নয়। বিবিসি সায়েন্স ফোকাসের তথ্য মতে, জেব্রা, বাইসন, হাতি ও জিরাফের মতো অন্যান্য বড় তৃণভোজী প্রাণীরা পায়ের ওপর ভর দিয়ে ঘুমাতে পারে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স ও বিবিসি সায়েন্স ফোকাস