রক্ত দিয়ে যিনি বাঁচিয়েছেন ২৪ লাখ শিশুর প্রাণ
জেমস হ্যারিসনের পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন ‘সোনালি বাহুর মানুষ’ হিসেবে। কারণ তাঁর রক্তে ছিল একটি বিরল অ্যান্টিবডি। যা অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ২৪ লাখের বেশি শিশুকে সাহায্য করেছে। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি আমাদের অনেকের মতোই সুঁই পছন্দ করতেন না। যখনই তিনি রক্তের প্লাজমা দান করতেন, সূচ তাঁর হাতে প্রবেশ করানোর সময় অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতেন।
চিকিৎসাবিদেরা মনে করেন, হ্যারিসন ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক রক্তদাতা। তিনি ১ হাজার ১৭৩ বার রক্তদানের জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি সম্ভবত বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্তদাতাদের একজন। কারণ তাঁর প্লাজমার বিরল অ্যান্টিবডি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা একটি ওষুধ (ইনজেকশন) তৈরি করেছেন, যা প্রায় ২৪ লাখ শিশুকে সম্ভাব্য রোগ বা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে।
জেমস ক্রিস্টোফার হ্যারিসন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর। নিউ সাউথ ওয়েলসের ছোট শহর জুনিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা-মায়ের নাম ছিল পেগি ও রেজিনাল্ড। হ্যারিসন তাঁর পারিবারিক পদবি।
এক সাক্ষাৎকারে হ্যারিসনের নাতি জ্যারড মেলোশিপ বলেছেন, ‘তিনি শুধু কাজটা করে গিয়েছেন, থামেননি। তিনি এটিকে অপরিহার্য মনে করতেন না। তবে তিনি কাজটা করতে চেয়েছিলেন।’
জেমস হ্যারিসনকে মানুষ ভালোবাসত। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির যেখানে নিয়মিত রক্ত দিতেন, সেই কেন্দ্র থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে একটি নার্সিং হোমে ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি ঘুমের মধ্যে মারা যান। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
হ্যারিসনের প্লাজমায় বিরল অ্যান্টিবডি অ্যান্টি-ডি (Anti-D) ছিল। অস্ট্রেলিয়ান রেড ক্রস ‘লাইফব্লাডের’ মতে, বিজ্ঞানীরা এটি ব্যবহার করে একটি ওষুধ তৈরি করেছিলেন, যা এমন গর্ভবতী মায়েদের শরীরে প্রয়োগ করা হয়, যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গর্ভের ভ্রূণের লোহিত রক্তকণিকার ওপর আক্রমণ করতে পারে।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মতে, অ্যান্টি-ডি এমন সমস্যা প্রতিরোধে সহায়তা করে, যা সাধারণত ঘটে, যখন গর্ভের শিশুর এবং মায়ের রক্তের ধরন ভিন্ন হয়। এটি বেশি দেখা যায় যদি ভ্রূণের রক্ত ‘পজিটিভ’ হয় এবং মায়ের রক্ত ‘নেগেটিভ’ হয়। (এই পজিটিভ ও নেগেটিভ গ্রুপকে রিসাস ফ্যাক্টর বা Rh ফ্যাক্টর বলে)
মায়ের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভ্রূণকে অপরিচিত হিসেবে মনে করলে ভ্রূণ ও নবজাতকের জন্য এটি বিপজ্জনক হতে পারে। মারাত্মক অবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যাকে বলে হেমোলাইটিক ডিজিজ। এটি রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া) ও জন্ডিস সৃষ্টি করতে পারে।
এই সমস্যা তুলনামূলকভাবে বিরল। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক জানিয়েছে, প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মের মধ্যে প্রায় ২৭৬জন শিশুর ক্ষেত্রে এ ধরনের রক্তের অসঙ্গতির কারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তবে চিকিৎসকেরা আগে থেকে নিশ্চিত করতে পারেন না যে এমন রক্তের পার্থক্য (ভ্রূণের রক্ত ‘পজিটিভ’ হয় এবং মায়ের রক্ত ‘নেগেটিভ’) গুরুতর সমস্যার কারণ হবে কি না। তাই অস্ট্রেলিয়ায় এই ওষুধটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সব নেগেটিভ অ্যান্টিবডি রক্তের গর্ভবতী মায়েদের শরীরের প্রয়োগের প্রচলন রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ বা প্রতি বছর প্রায় ৪৫ হাজার নারীর এই ওষুধের প্রয়োজন হয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এই হার প্রায় ১৫ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের ওয়াল্টার এবং অ্যালাইজা হল ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল রিসার্চের বিজ্ঞানীরা ওষুধটির একটি কৃত্রিম সংস্করণ তৈরির জন্য কাজ করছেন। কৃত্রিম ওষুধকে অনেকেই বলছে ‘জেমস ইন আ জার’। মজার এই নামের মানে, জেমস হ্যারিসনের রক্ত জার বা প্যাকেটের মধ্যে নিয়ে আসা। এটি হবে এমন একটি অ্যান্টিবডি, যা ল্যাবে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
তবে বর্তমানে এই ওষুধ তৈরিতে রক্তাদাতার থেকে রক্ত সংগ্রহ করা ছাড়া অন্য উপায় নেই। অ্যান্টি-ডি ইনজেকশন তৈরি করা হয় দান করা প্লাজমা থেকে। লাইফব্লাডের মতে, জেমস হ্যারিসন ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র ২০০ জন বিশেষ রক্তদাতার মধ্যে একজন।
লাইফব্লাডের মুখপাত্র জেমা ফ্যালকেনমায়ার বলেছেন, ‘মিস্টার হ্যারিসনের ৬৪ বছর ধরে রক্তদান করেছেন। এটি নির্দিষ্ট কোনো বীরত্বপূর্ণ কাজ না। ১৯৫৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত রক্তদান করেছেন। এটি ধাপে ধাপে ছোট ছোট ভালো কাজের একটি লম্বা যাত্রা।’
একটি শিশুকে বাঁচানো ভালো, ২০ লাখ শিশুকে বাঁচানো কল্পনা করাও কঠিন, কিন্তু যদি তারা বলে যে এটি সত্য, তবে আমি খুশি যে আমি এটি করতে পেরেছি।২০১৮ সালে শেষবার রক্তদানের পর জেমস হ্যারিসন
হ্যারিসন মাঝে মধ্যে সেসব মায়েদের সঙ্গে দেখা করতেন, যাদের তিনি সাহায্য করেছিলেন। যদিও সাহায্য পাওয়া মায়েদের বেশিরভাগই ছিল অপরিচিত। তবে তিনি দুজনকে খুব ভালোভাবে চিনতেন। তাঁর মেয়ে ট্রেসি মেলোশিপ মিস্টার হ্যারিসনের প্লাজমা থেকে তৈরি একটি অ্যান্টি-ডি ইনজেকশন পেয়েছিলেন। একই ওষুধ পেয়েছিলেন তাঁর নাতি মেলোশিপের স্ত্রী রেবেকা মেলোশিপ। হ্যারিসনের ৫৮ বছর বয়সী মেয়ে ট্রেসি নিউইয়র্ক টাইমসকে ইমেইলে জানিয়েছেন, ‘এটি আমার জন্য বিশেষ কিছু ছিল, আমি বাবার দেওয়া অ্যান্টি-ডি পেয়েছি’।
হ্যারিসনের রক্তদানের বিষয়টির গুরুত্ব শুধু বিরল অ্যান্টিবডিতেই শেষ না, মূল বিষয়টি ছিল রক্তদানের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি। তিনি ১৮ বছর বয়স থেকে ৮১ বছর বয়স পর্যন্ত, প্রায় প্রতি দুই সপ্তাহে একবার করে রক্ত বা প্লাজমা দান করেছেন। ছুটিতেও তিনি রক্ত দেওয়া থামাননি। যখন তিনি ও তাঁর স্ত্রী বারবারা হ্যারিসন ক্যাম্পার ভ্যানে করে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করতেন, তখনও তিনি পথে বিভিন্ন ক্লিনিকে গিয়ে রক্তদান করেছেন। বারবারা নিজেও ছিলেন একজন নিয়মিত রক্তদাতা।
বার্ধক্যও হ্যারিসনকে দমাতে পারেনি। তাঁর বাড়ি থেকে রক্তদান কেন্দ্রে যেতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগত। এ সময় তিনি ট্রেনে যাতায়াত করতেন। কখনোই নির্ধারিত রক্তদান অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিস করেননি। লাইফব্লাডের মুখপাত্র মিস ফ্যালকেনমায়ার বলেছেন, হ্যারিসন রক্ত সঞ্চালনের সময় তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। তিনি গল্প করতে পছন্দ করতেন। আবার নিজের মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর সুযোগও খুঁজতেন। সূচকে ভীষণ ভয় পেতেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
হ্যারিসন নিজের কাজের গুরুত্ব খুব ভালোভাবে বুঝতেন। ১৪ বছর বয়সে তাঁর ফুসফুসে বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের সময় প্রচুর রক্তের দরকার হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে রক্তদানে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি অন্যদেরও রক্তদানে উৎসাহিত করতেন। তিনি নতুন দাতাদের অভিনন্দন জানাতেন। বলতেন, ‘আপনাদের কাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ’। তবে নিজের রক্তদানের ব্যাপারে কিছুই বলতেন না।
জেমস ক্রিস্টোফার হ্যারিসন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর। নিউ সাউথ ওয়েলসের ছোট শহর জুনিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা-মায়ের নাম ছিল পেগি ও রেজিনাল্ড। হ্যারিসন তাঁর পারিবারিক পদবি।
ফুসফুসের অস্ত্রোপচারে সুস্থ হওয়ার পর কিশোর বয়সেই নিজের ভবিষ্যৎ স্ত্রী বারবারা লিন্ডবেকের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। বারবারা ছিলেন একজন শিক্ষক, যিনি ২০০৫ সালে মারা যান। হ্যারিসন আঞ্চলিক রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের একজন কেরানি হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর দানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে ‘মেডেল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’য় ভূষিত হন তিনি।
২৪ লাখ শিশুর জীবন রক্ষার বিষয়টি তিনি ভিন্নভাবে দেখতেন। ২০১৮ সালে শেষবার রক্তদানের পর তিনি বলেছিলেন ‘একটি শিশুকে বাঁচানো ভালো, ২০ লাখ শিশুকে বাঁচানো কল্পনা করাও কঠিন, কিন্তু যদি তারা বলে যে এটি সত্য, তবে আমি খুশি যে আমি এটি করতে পেরেছি।’
হ্যারিসনের ইচ্ছা ছিল রক্তদান চালিয়ে যাওয়ার। সম্ভব হলে আরও বেশি রক্তদান করতে চেয়েছিলেন তিনি। নাতি জ্যারড মেলোশিপ জানিয়েছে, তিনি মনে করতেন, রক্তদান করতে পারলে পৃথিবী সঠিক পথে এগোচ্ছে বলে মনে হবে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস