পোলাও, কোরমা, সেমাই— ঈদের এই খাবারগুলো কোথা থেকে এল

সারা বিশ্বে মুসলমানদের জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে  আসে একফালি চাঁদ। রমজান মাস বা সংযমের মাস শেষ, ঈদ উল ফিতর উৎসবের দিন। আর এই উৎসবে বাড়তি মাত্রা যোগ করে ঈদের দিনের খাবার। বাংলাদেশে ঈদের দিনে নানা মজার মজার খাবার খাই আমরা। বেশীরভাগ খাবার এখন পুরোপুরি আমাদের দেশের মনে হলেও, আদতে তা কিন্তু নয়। কিছু কিছু খাবারের জন্ম এদেশে, অনেকগুলোরই বিদেশে।    

সেমাই জর্দাছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

সেমাই

সেমাই একদম আমাদের দেশী খাবার। ইতিহাসবিদদের মতে, এই বাংলাদেশেই প্রথম সেমাই খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়েছিল। আমাদের দেশে ঈদে সেমাই খাওয়ার বিষয়টা এমনভাবে  যুক্ত যে এদেশে অনেকে ঈদ উল ফিতরকে ‘সেমাই ঈদ’ বলে ডাকে। সেমাইয়ের আছে রকম ফের। সেমাই, দুধ সেমাই, সাধারণ সেমাই,  ঘিয়ে ভাজা সেমাই। তবে সেমাই মূলত দুই রকমের হয়, চিকন বা খিল সেমাই, আর লাচ্ছা সেমাই।  

সেমাইকে অনেকে বলে ভার্মিচিলির জাত ভাই। ভার্মিচিলি দেখতে মোটেও প্যাঁচালো নয়, ইতালির পাস্তা বা চীনের নুডুলস-এর মত সোজা। তবে আমরা যে সেমাই খাই সেটা দুধ, চিনি, বাদাম, পেস্তা, কিসমিস ইত্যাদি দিয়ে রান্না করা হয়। 

হালুয়া 

মিষ্টি আলুর পুডিং ও তিলের হালুয়া

ঈদের দিনে অনেকে হালুয়া খেতে পছন্দ করে। ঈদের দিনে সুজির, বুটের, গাজরের হালুয়া খেতে আমরা অনেকে পছন্দ করি। হালুয়া কোথা থেকে এলো এই নিয়ে আরব ও ইরানের মধ্যে আবার ঝগড়া। আরবরা বলে এটা আমাদের এখান থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে, আর ইরান বলে না, আমরাই বিশ্বকে চিনিয়েছি হালুয়া কত না সুস্বাদু।

জর্দা 

জর্দা মানে কিন্তু হলুদ। আর এটা ফার্সি শব্দ। তার মানে ঈদে বা উৎসবে ঝাল খাবার শেষে হলুদ রঙা ভাতের মতো মিষ্টি এক খাবার খাই, সেটা জর্দা। নাম শুনেই বোঝা যায় ছোট ছোট মিষ্টিসহ এই মিষ্টি খাবারটি এসেছে ইরান বা পারস্য থেকে। একে আবার পানের জর্দা ভেবো না।

আরও পড়ুন

পোলাও

পোলাওয়ের আদি রেসিপি ইরাক থেকে এসেছে। আব্বাসীয় খলিফাদের রসুই ঘরে পোলাওয়ের জন্ম। এরপর পোলাও প্রথমে গিয়ে হাজির হয় স্পেনে। সেই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া মানে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের এক জনপ্রিয় খাবারে পরিণত হয় পোলাও। পোলাও শব্দটা পার্সি,  মানে ইরানের পিলাভ বাংলাদেশে এসে হয়েছে পোলাও হয়েছে আর স্পেনে এ রকম খাবারের নাম হয়ে গেছে পায়েয়া। 

মোরগ পোলাও

নাম শুনলেই জিভে পানি এসে যায় এমনই সুস্বাদু খাবার মোরগ পোলাও। আর এটা শুনতে আরো ভালো লাগবে যে এই খাবারটা আমাদের একেবারে দেশী খাবার। এই খাবারের আবিষ্কার হয়েছে বাংলাদেশের পুরান ঢাকায়। এটা আমাদের ঈদের খাবারের তালিকায় অন্যতম সেরা এক খাবার। সুগন্ধি পোলাওয়ের চালের সঙ্গে মোরগের মাংস ও নানান রকম মশলা, দই, দুধ ইত্যাদি মাখিয়ে ধীরে ধীরে এটি রান্না করতে হয়। সারা দেশে ভোজন রসিকদের ঈদের খাবারের তালিকায় থাকা সবচেয়ে পছন্দের খাবার এটি।        

বিরিয়ানি

মালাবার চিকেন দম বিরিয়ানি

খাবারটি উপমহাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এক খাবার। তবে  একেবারে আদি এদেশের বলা যাবে না। বিরিয়ানি শব্দটি এসেছে ফার্সি বিরিঞ্জ শব্দ থেকে। আধুনিক ইরান–এর ভাষায় এর মানে হলো চাল। আবার কারো মতে বিরিয়ানি মানে হলো ভাজা। আবার কারো মতে বেরেস্তান থেকে বিরিয়ানি শব্দটি এসেছে। এর মানে কিন্তু পেয়াজ ভাজা। যেহেতু বিরিয়ানিতে পেয়াজ বেরেস্তা করে মানে ভেজে দেওয়া হয়, সে কারণে এর নাম বিরিয়ানি।  এখন এটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার। মাংস, সুগন্ধি চাল ও নানান মসলা দিয়ে বিরিয়ানি রান্না হয়।  ঈদের অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার বিরিয়ানির এখন সারা বিশ্বে বেশ নামডাক। কাচ্চি, পাক্কি যেমন দুটি জনপ্রিয় বিরিয়ানি আবার এলাকা ভেদে এর রান্নার ধরণ আলাদা নামও আলাদা, যেমন ঢাকাই, হায়দ্রাবাদী, বোম্বাই, হাজির বিরিয়ানি, বাগদাদী, করাচী, কলকাতা, দক্ষিণ ভারতের ভাটকাল বিরিয়ানি।  গন্ধের সাথে মিলিয়ে নাম যেমন আম্বর (সুগন্ধি) বিরিয়ানি, তেমনি জাতির নামে বিরয়ানী রয়েছে যেমন বোহারী বিরিয়ানি, (ভারত পাকিস্তান, ইয়েমেনের একদল মুসলমান)  মেমান  ( ভারতের গুজরাট ও পাকিস্তানের সিন্ধু এলাকায় বেশী বাস করা একদল মুসলমান ) বিরিয়ানি । তবে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় নামে যাই হোক সব ধরণের বিরিয়ানি খেতে সুস্বাদু।

ঝাল মাংস  

রান্নাটা এসেছে মোঘলদের কাছ থেকে। মোঘল বাদশা বাবুর কামানের সাহায্যে কেবল উপমহাদেশ দখল করে ক্ষান্ত দেননি, তিনি ও তাঁর বংশধরেরা মোঘল খাবারকে এই দেশের রান্নাঘরেও ঢুকিয়েছেন, বিশেষ করে এখনকার উৎসবের খাবারের একটা বড় অংশ মোঘলদের হেঁসেল থেকে আসা। 

ঈদের দিনে আমরা ঝাল মাংস খাই। আমরা সেটার রান্নার প্রণালী আমরা পেয়েছি মোঘলদের কাছ থেকে। এমন কী যে আলু দক্ষিণ আমেরিকার খাবার, আমাদের দেশে ঝাল মাংসে সেই আলুর প্রবেশ ঘটিয়েছিল মোঘলরা।

কাবাব

এটাও ঈদের জনপ্রিয় খাবার। আর এই কাবাব এসেছে মোঘলদের রান্নাঘর থেকে। তবে কাবাবের জন্ম কিন্তু মধ্য এশিয়ায়। কারো মতে অনেক আগে তুরস্ক, ইরাক এসব অঞ্চলে কাবাব খাওয়া হতো। বলা হয়ে থাকে কয়েক  হাজার বছর আগে ব্যাবিলন  মানে আজকের ইরাক থেকে সারা বিশ্বে কাবাবের সুগন্ধ ছড়িয়েছিল। সেখানকার এক ভাষায় কাব শব্দটি ছিল, আর কাব মানে হচ্ছে পোড়ানো। সেই থেকে পুড়িয়ে মাংস খাওয়া খাবারটি নাম কাবাব। এখন আমরা শামি কাবাব, হাণ্ডি কাবাব, টিক্কা কাবাব, কাঠি কাবাব, শাসলিক,  ইত্যাদি আরো অনেক কাবাব খাই।  তুরস্কে একটি কাবাবের নাম ইস্কান্দার কাবাব। ইস্কান্দার মানে গ্রীক ভাষায় আলেকজান্ডার। তবে গ্রীক বীর আলেকজান্ডার নয়, ১৮৬৭ সালে তুরস্কের বুরসা এলাকার ইস্কান্দার আফেন্দি নামের এক রাঁধুনি এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাবাব রান্না করা শুরু করেন। তিনি কাবাবকে ওপর নীচ করে রেখে ভেজে সেটাতে মশলা দই, টমেটোর চাটনি ইত্যাদি দিয়ে পরিবেশন করেন।   

কোরমা

 কোরমা শব্দটি তুরস্ক থেকে আসা। যার মানে কোনো কিছুকে ভাজা, কিন্তু বাংলাদেশে এসে এই খাবারটি এদেশের হয়ে গেছে। 

মাংস, দই, কাচা মরিচ, গরম মসলা আর ঘি দিয়ে সামান্য ঝোল রেখে যে ভাবে মাংস রান্না হয় সেটাই আমাদের কোরমা। এদেশের কোরমা স্বাদে খানিকটা মিষ্টি হয়। এর নামও বেশ,  চিকেন কোর্মা, মাটন কোর্মা, চিকেন হোয়াইট কোর্মা, দম কোর্মা, সবজি কোরমা ইত্যাদি।    

আরও পড়ুন

কোফতা

ঈদের দিনে আমরা মাংসের যে কোফতা খাই সেটার আদি জন্মভূমি মধ্য এশিয়া ও বলকান অঞ্চল মানে মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, বসনিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি এ সব অঞ্চল থেকে। তবে  এদেশে এসে কোফতার রান্না ও স্বাদ খানিকটা পালটে গেছে।

বোরহানি

ঈদের দিনের সফট ড্রিংক্স  ছাড়াও আমরা খাই এক মজাদার পানীয় যার নাম বোরহানি। ভাষাবিদেরা এর নাম শুনে বলছেন এটা এসেছে ইরান থেকে , আর খাদ্য বিশারদেরা বলছেন এটা এসেছে মোঘলদের কাছ থেকে। কারণ বোরানি শব্দটি ফার্সি, যার মানে দইয়ের সাথে পুদিনা মিশিয়ে  খাওয়া। আর আমরা নাকি এটা খেতে শিখেছি মোঘলদের কাছ থেকে।  

ফালুদা 

ফালুদা
ছবি: উইকিপিডিয়া

ঈদে অনেকে ফালুদা খেতে পছন্দ করে। বিশেষ করে গরম কালে। এটা অবশ্য খাঁটি ইরানি খাবার। কারণ ফালুদা শব্দটি এসেছে ফার্সি  ফালুদে থেকে। ফালুদার জন্মভূমি ইরানের এক অঞ্চল সিরাজে। সেমাই বা নুডুলস, গোলাপ জল, বেসিল বীজ, জেলির টুকরা, সাগু, দুধ ও আইসক্রিম দিয়ে  তৈরি করা হয় এই মজাদার খাবার ফালুদা।

আরও পড়ুন